ছেলের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ, আদালতে কিম জোলসিয়াকের জোরালো সাফাই

ছেলেকে নির্দোষ দাবি মায়ের, তবে আদালতে নতুন বিস্ফোরক তথ্য ঘিরে ১৫ বছরের কিশোরের মামলায় বাড়ছে চাঞ্চল্য ও রহস্য।

ছেলের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ, আদালতে কিম জোলসিয়াকের জোরালো সাফাই

ছেলের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ, আদালতে কিম জোলসিয়াকের জোরালো সাফাই


যুক্তরাষ্ট্রের রিয়েলিটি টেলিভিশন তারকা কিম জোলসিয়াকের ১৫ বছর বয়সী ছেলে কেজে বিয়ারম্যানকে ঘিরে যৌন নিপীড়নের মামলায় নতুন করে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। শুক্রবার জর্জিয়ার ফুলটন কাউন্টি সুপিরিয়র কোর্টে তার জামিন শুনানির সময় প্রসিকিউশন এমন কিছু তথ্য আদালতে উপস্থাপন করেছে, যা মামলাটিকে আরও গুরুতর পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি এবং কেজে বিয়ারম্যান নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছেন।

কেজে বিয়ারম্যান হলেন টেলিভিশন তারকা কিম জোলসিয়াক ও সাবেক পেশাদার ফুটবলার ক্রয় বিয়ারম্যানের ছেলে। গত ১৭ আগস্ট জর্জিয়ার আলফারেটায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। শুরুতে তার বিরুদ্ধে গুরুতর যৌন অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। পরে ৩ সেপ্টেম্বর জর্জিয়ার একটি গ্র্যান্ড জুরি তাকে সাতটি গুরুতর অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। এর মধ্যে রয়েছে গুরুতর শিশু যৌন নির্যাতন, গুরুতর যৌন নিপীড়ন, গুরুতর যৌন অপরাধ এবং বেআইনিভাবে আটকে রাখার অভিযোগ। একই ঘটনার সঙ্গে ১৬ বছরের কম বয়সী একজন শিশুকে কেন্দ্র করে একাধিক যৌন নিপীড়নের অভিযোগও রয়েছে।

মামলার মূল অভিযোগটি ২০২৬ সালের ২৩ এপ্রিলের একটি ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় কেজের বয়স ছিল ১৪ বছর। অভিযোগকারী কিশোরীও তার পরিচিত ও সহপাঠী ছিলেন বলে আদালতের নথি এবং প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আলফারেটার একটি ব্যায়ামকেন্দ্রে তাদের মধ্যে দেখা হয় এবং পরে একটি পারিবারিক পোশাক পরিবর্তন কক্ষের মধ্য দিয়ে একটি যৌথ ব্যবহারের সৌনা এলাকায় যাওয়ার ঘটনা ঘটে।


অভিযোগকারী পুলিশকে যে বক্তব্য দিয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তাতে তিনি দাবি করেন, কেজে তার সম্মতি ছাড়া যৌন আচরণ করেন এবং তিনি একাধিকবার আপত্তি জানান। পরে পুলিশ ওই ব্যায়ামকেন্দ্রের নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ফুটেজে দুজনকে ওই স্থানে প্রবেশ করতে দেখা গেলেও অভিযোগের প্রতিটি অংশের সত্যতা ফুটেজের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে—এমন দাবি করা হয়নি।

ঘটনার পর অভিযোগকারী হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। প্রকাশিত আদালত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরীক্ষায় অভিযোগকারীর শরীরে কেজের সঙ্গে সম্পর্কিত পুরুষের কোনো DNA পাওয়া যায়নি। তবে কোনো শারীরিক পরীক্ষায় DNA না পাওয়া একাই কোনো অভিযোগ সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করে না—মামলার অন্যান্য প্রমাণও আদালতকে বিবেচনা করতে হবে।


অন্যদিকে কিম জোলসিয়াক শুরু থেকেই ছেলের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি প্রকাশ্যে অভিযোগগুলোকে অস্বীকার করে বলেছেন, তার ছেলে ওই নারীর সঙ্গে এমন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা категорically অস্বীকার করেছে। তিনি আরও জানান, তার ছেলে স্বেচ্ছায় মিথ্যা শনাক্তকারী পরীক্ষা দিয়েছে এবং সেটিতে উত্তীর্ণ হয়েছে বলে পরিবার দাবি করছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আলাদা একটি পরীক্ষাতেও তার ছেলের DNA পাওয়া যায়নি।


কিমের বক্তব্যের মূল অবস্থান হলো—কেবল অভিযোগ উঠেছে বলেই কাউকে দোষী হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়। তিনি একই সঙ্গে বলেন, প্রকৃত অভিযোগ অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা উচিত এবং সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে। তার এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থায় প্রযোজ্য নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কেজের আইনজীবী জেসন শেফিল্ডও তার মক্কেলের নির্দোষতার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি আদালতে কেজকে জামিন দেওয়ার আবেদন করেন। আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, কেজ একজন ভালো শিক্ষার্থী, ফুটবলার হিসেবে তার ভালো রেকর্ড রয়েছে এবং খেলাধুলার জন্য সে বৃত্তির প্রস্তাবও পেয়েছে। প্রতিরক্ষা পক্ষ আদালতকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে কেজকে আটকে রাখার পরিবর্তে কঠোর শর্তে পরিবারের তত্ত্বাবধানে রাখা যেতে পারে।


শুক্রবারের জামিন শুনানিতে প্রতিরক্ষা পক্ষ ৬৫ হাজার ডলারের জামিনের প্রস্তাব দেয়। অন্যদিকে প্রসিকিউশন অনেক বেশি অঙ্কের জামিন দাবি করে এবং অভিযোগগুলোর গুরুতরতা ও অভিযোগকারীর নিরাপত্তার বিষয়টি আদালতের সামনে তুলে ধরে। অভিযোগকারী পক্ষের একটি বক্তব্যও আদালতে পড়ে শোনানো হয়, যেখানে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় নতুন তথ্য আসে প্রসিকিউশনের বক্তব্য থেকে। শুনানিতে প্রসিকিউটর দাবি করেন, তদন্তকারীরা কেজের ফোনে এমন কিছু ভিডিও পেয়েছেন, যেখানে ১২ বছরের কম বয়সী এক পরিবারের সদস্যের সঙ্গে যৌন সম্পর্কের দৃশ্য রয়েছে বলে অভিযোগ। প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, ভিডিওতে একাধিক ঘটনার ইঙ্গিত রয়েছে। এই নতুন অভিযোগ মামলাটিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুক্রবারের শুনানিতে এসব তথ্য প্রসিকিউশনের পক্ষের অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে; এগুলো কেজের বিরুদ্ধে আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত সত্য নয়।

প্রসিকিউশন আরও দাবি করেছে, ওই নতুন অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনা ২০২৫ সালের অক্টোবরের সময়কালের এবং কেজ তখন আদালতের তত্ত্বাবধানের মধ্যে ছিল। তবে এই নতুন তথ্যের আইনি প্রভাব কী হবে, তা আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমে পরিষ্কার হবে। কেজের আইনজীবী নতুন অভিযোগ নিয়ে শুক্রবার বিস্তারিত মন্তব্য করেননি, যদিও মূল মামলায় তিনি ধারাবাহিকভাবে তার মক্কেলের নির্দোষতার দাবি করে আসছেন।

এদিকে কেজ বর্তমানে আটলান্টার মেট্রো রিজিওনাল ইয়ুথ ডিটেনশন সেন্টারে আটক রয়েছেন। গ্রেপ্তারের পর থেকে তিনি জামিন ছাড়াই আটক ছিলেন। তার আইনজীবীরা মামলাটি শিশু আদালতে স্থানান্তরের আবেদন করেছেন। এর অর্থ হলো, কেজকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিচার করা হবে নাকি কিশোর বিচারব্যবস্থার আওতায় রাখা হবে—এটি মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কেজের পক্ষ থেকে অক্টোবর ১৪ তারিখের নির্ধারিত অভিযোগ গঠনের শুনানিতে সব অভিযোগ অস্বীকার করে নির্দোষ দাবি করার প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা পক্ষ মামলার কার্যক্রম গোপন রাখার এবং কিশোর আদালতে স্থানান্তরের চেষ্টা করছে।


শুক্রবারের শুনানিতে বিচারক মেলিনি লেফট্রিজ জামিনের বিষয়ে তাৎক্ষণিক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি। প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিচারক সোমবারের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়ার কথা বলেছেন। ফলে কেজে এখনই মুক্তি পাচ্ছেন কি না, তা আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।


আদালতে কেজের বাবা-মাও উপস্থিত ছিলেন। কিম জোলসিয়াক এবং ক্রয় বিয়ারম্যান আলাদাভাবে আদালতে আসেন। তাদের মেয়ে ব্রিয়েল বিয়ারম্যানও উপস্থিত ছিলেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিম পুরো শুনানির সময় ছেলের পাশে ছিলেন এবং ক্রয়কেও আদালতে দেখা যায়। দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে আইনি বিরোধ চললেও ছেলেকে ঘিরে এই মামলায় দুজনকেই আদালতে উপস্থিত হতে দেখা গেছে।

এই মামলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কেজে এখনো আইনগতভাবে দোষী সাব্যস্ত হননি। তার বিরুদ্ধে গ্র্যান্ড জুরি অভিযোগপত্র দিয়েছে এবং প্রসিকিউশন গুরুতর অভিযোগ উপস্থাপন করেছে—কিন্তু অভিযোগপত্র বা গ্রেপ্তার কোনো ব্যক্তিকে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের আগে অপরাধী প্রমাণ করে না। প্রতিরক্ষা পক্ষ অভিযোগগুলো অস্বীকার করছে এবং আদালতে প্রমাণ উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।


মামলাটি এখন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি। প্রথমত, কেজে জামিন পাবেন কি না। দ্বিতীয়ত, তাকে কিশোর আদালতে বিচার করা হবে নাকি প্রাপ্তবয়স্কদের আদালতের ব্যবস্থায় রাখা হবে। তৃতীয়ত, প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত ভিডিও, নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ, ফোন-সংক্রান্ত তথ্য, শারীরিক পরীক্ষার ফলাফল এবং সাক্ষীদের বক্তব্য আদালতে কীভাবে মূল্যায়িত হবে। এসব প্রশ্নের উত্তর আগামী শুনানিগুলোতে ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে পারে।


কিম জোলসিয়াকের অবস্থান অবশ্য এখনো অপরিবর্তিত—তিনি তার ছেলের নির্দোষতার ওপর আস্থা রাখছেন। অন্যদিকে প্রসিকিউশন বলছে, অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা বিবেচনা করা জরুরি। ফলে মামলাটি শুধু একটি তারকা পরিবারের ব্যক্তিগত সংকট নয়; এটি কিশোর অপরাধ, যৌন নিপীড়নের অভিযোগ, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা এবং কিশোরকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিচার করার মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নও সামনে এনেছে।

এ মুহূর্তে চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণের ক্ষমতা আদালতের। অভিযোগকারী পক্ষের বক্তব্য যেমন তদন্তের অংশ, তেমনি কেজে বিয়ারম্যানের নির্দোষতার দাবি এবং তার আইনজীবীর উপস্থাপিত প্রমাণও আদালতের বিবেচনায় আসবে। তাই বিচারিক সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত কোনো পক্ষকেই চূড়ান্তভাবে সত্য বা মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করা আইনগত ও সাংবাদিকতাগতভাবে সমীচীন নয়।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর