বিটিভির লোগো বদল নিয়ে বিতর্ক, ঐতিহ্য রক্ষার দাবি শায়রুল কবিরের

বিটিভির লোগো বদলের উদ্যোগে নতুন বিতর্ক: ঐতিহ্য রক্ষার পক্ষে বিএনপি মিডিয়া সেলের শায়রুল কবির।

বিটিভির লোগো বদল নিয়ে বিতর্ক, ঐতিহ্য রক্ষার দাবি শায়রুল কবিরের

বিটিভির লোগো বদল নিয়ে বিতর্ক, ঐতিহ্য রক্ষার দাবি শায়রুল কবিরের


বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) বহুল পরিচিত লাল-সবুজ লোগো বদলের উদ্যোগকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা এখন আর কেবল একটি গ্রাফিক নকশা পরিবর্তনের আলোচনা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশের টেলিভিশন সম্প্রচারের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় পরিচয়, শিল্পীদের সৃজনশীল অবদান এবং কয়েক প্রজন্মের দর্শকের স্মৃতি।

‘ফিরছে নতুন রূপে বিটিভি’—এই স্লোগানে নতুন লোগোর আইডিয়া ও নকশা আহ্বান করেছে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমটি। বিটিভির প্রচারিত আহ্বানে নকশা জমা দেওয়ার সময়সীমা ১০ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছিল। ঘোষণাটি প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা।

এই বিতর্কে এবার প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান। ‘বিটিভি: শৈশবের স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চিহ্ন’ শিরোনামে তাঁর লেখা মতামত ৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তিনি বর্তমান লোগোকে শুধু একটি ব্র্যান্ড চিহ্ন হিসেবে নয়, বাংলাদেশের টেলিভিশন ও রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারের দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।

শায়রুল কবিরের যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—বিটিভির দর্শক হারানোর প্রধান কারণ কি লোগো, নাকি অনুষ্ঠান, সংবাদ, সৃজনশীলতা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দীর্ঘমেয়াদি সংকট?

লোগো পরিবর্তনের ঘোষণাই কেন এত আলোড়ন তুলেছে

বিটিভির বর্তমান পরিচিত লোগোর কেন্দ্রে রয়েছে একটি টেলিভিশন ফ্রেম, তার ভেতরে উদীয়মান লাল সূর্য এবং সবুজ বেষ্টনী। জাতীয় পতাকার রং ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয়-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে এর দৃশ্যমান সম্পর্ক বহু বছর ধরে দর্শকের কাছে এটিকে একটি পরিচিত প্রতীকে পরিণত করেছে।

সাম্প্রতিক আলোচনায় শিল্পী ইমদাদ হোসেন, মুস্তাফা মনোয়ার, কামরুল হাসানসহ একাধিক শিল্পীর অবদানের কথা উঠে এসেছে। তবে লোগোটির সুনির্দিষ্ট নকশাগত ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে শিল্পীদের ভূমিকার বর্ণনায় পার্থক্য রয়েছে। প্রথম আলোর সাম্প্রতিক একটি বিশদ লেখায় বলা হয়েছে, প্রাথমিক খসড়ায় মুস্তাফা মনোয়ারের ভূমিকা ছিল এবং ইমদাদ হোসেন সেটিকে পূর্ণাঙ্গ করেন; ১৯৮০ সালে রঙিন সম্প্রচার শুরুর সময় মুস্তাফা মনোয়ার পুরোনো কাঠামোটিকে জ্যামিতিকভাবে পরিশুদ্ধ করে নতুন রঙিন রূপ দেন।

অন্যদিকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও দ্য ডেইলি স্টারের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে ইমদাদ হোসেন, কামরুল হাসান ও মুস্তাফা মনোয়ারের অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং ১৯৮০ সালের রঙিন সম্প্রচারের সময় মুস্তাফা মনোয়ারের পুনর্নকশার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। 

অর্থাৎ, বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা লোগোটি হঠাৎ তৈরি কোনো আধুনিক করপোরেট প্রতীক নয়; এর শিকড় বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়ে। 

১৯৮০: রঙিন পর্দার সঙ্গে লোগোর নতুন যাত্রা

বিটিভির সরকারি ইতিহাস অনুযায়ী, ২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৪ সালে ঢাকার তৎকালীন ডিআইটি ভবনে টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হয়। ১৯৬৭ সালে এটি পাকিস্তান টেলিভিশন করপোরেশনের অংশ হয় এবং স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশন হিসেবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ১৯৭৫ সালে রামপুরার নিজস্ব ভবনে এর সম্প্রচার কার্যক্রম স্থানান্তরিত হয়। 

১৯৮০ সালে বিটিভি রঙিন সম্প্রচারে প্রবেশ করে। সমসাময়িক ও পরবর্তী বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১ ডিসেম্বর ১৯৮০ রঙিন সম্প্রচারের সূচনা হয় এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান উদ্বোধন করেন। একই সময়ে লোগোটিও রঙিন ও পরিশীলিত রূপ পায়।

ফলে বর্তমান লোগোকে কেবল ‘পুরোনো’ বলা সহজ হলেও এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারের প্রযুক্তিগত বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

শৈশবের স্মৃতি থেকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রতীক

বাংলাদেশে টেলিভিশনের প্রথম যুগে বিটিভিই ছিল প্রায় একমাত্র ঘরে ঘরে পৌঁছানো সম্প্রচারমাধ্যম। ১৯৮০-এর দশক থেকে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত এর নাটক, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, শিশু-কিশোর অনুষ্ঠান, সংগীত ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংস্কৃতির বড় অংশ হয়ে ওঠে।

‘যদি কিছু মনে না করেন’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আজ রবিবার’—এ ধরনের অনুষ্ঠান ও ধারাবাহিক শুধু বিনোদন দেয়নি; একটি প্রজন্মের ভাষা, রুচি, হাস্যরস ও সামাজিক স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছিল। ফজলে লোহানীর ‘যদি কিছু মনে না করেন’ ১৯৭৭ সালে শুরু হয়েছিল এবং বিটিভির জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানগুলোর অন্যতম হয়ে ওঠে। 

এ কারণেই বিটিভির লোগো নিয়ে আপত্তিকে নিছক নস্টালজিয়া হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভিজ্যুয়াল পরিচয় দীর্ঘ সময় ধরে দর্শকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত থাকলে সেটি নিজেই একটি সাংস্কৃতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে।

শায়রুল কবিরের আপত্তি: ‘সমস্যা লোগোতে নয়’

শায়রুল কবির খানের বক্তব্যের মূল সুর হলো—বিটিভির সামনে থাকা বড় সমস্যাগুলো লোগো পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাধান হওয়ার নয়।

তিনি তাঁর মতামতে বিটিভির প্রতিষ্ঠা, মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্প্রচারের ভূমিকা, রামপুরা ভবন, রঙিন সম্প্রচার এবং পরবর্তী সময়ের সাংস্কৃতিক অবদানের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে, বর্তমান লোগোর সঙ্গে এই দীর্ঘ ইতিহাসের সম্পর্ক রয়েছে এবং নতুন লোগো আনার আগে সেই উত্তরাধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এ অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক মাত্রাও তৈরি করেছে। কারণ শায়রুল কবির বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য এবং তাঁর প্রকাশিত মতামতটি এমন সময়ে এসেছে, যখন বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে বিটিভির নেতৃত্বে নতুন পরিবর্তন এসেছে।

নতুন ডিজি কাজী জেসিন এবং ‘নতুন বিটিভি’র প্রশ্ন

৬ আগস্ট ২০২৬ সাংবাদিক ও উপস্থাপক কাজী জেসিনকে এক বছরের জন্য বিটিভির মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তিনি গ্রেড-১ পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পেয়েছেন। 

নতুন নেতৃত্বের আগমনের পর বিটিভিকে নতুনভাবে সাজানোর আলোচনা সামনে আসে। এরই মধ্যে লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগকে কেউ প্রতিষ্ঠানটির আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে দেখছেন। আবার সমালোচকদের একটি অংশের প্রশ্ন—আধুনিকায়নের প্রথম দৃশ্যমান পদক্ষেপ হিসেবে কেন লোগো পরিবর্তনকে সামনে আনা হলো?

এই প্রশ্নের উত্তরই সম্ভবত পুরো বিতর্কের কেন্দ্রে।

কারণ ব্র্যান্ডিংয়ের দৃষ্টিতে একটি লোগো পরিবর্তন প্রতিষ্ঠানের আধুনিকীকরণের প্রতীক হতে পারে। কিন্তু পাবলিক ব্রডকাস্টারের ক্ষেত্রে লোগো একই সঙ্গে ঐতিহাসিক স্মৃতি, রাষ্ট্রীয় পরিচয় এবং দর্শকের আস্থার প্রতীক। ফলে বাণিজ্যিক টেলিভিশনের মতো করে এর পুনঃব্র্যান্ডিং করা হলে প্রতিক্রিয়াও ভিন্ন হতে পারে।

শিল্পী ও সাবেক বিটিভি কর্মকর্তাদের আপত্তি

লোগো পরিবর্তনের বিরোধিতায় শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বিটিভির সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত শিল্পী ও সাবেক কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়াও সামনে এসেছে।

প্রথম আলোর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে সাবেক বিটিভি কর্মকর্তা ও শিল্পীদের একাংশের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের অনেকেই মনে করেন, লোগোটি সরল, অর্থবহ এবং ঐতিহাসিক ভিত্তিসম্পন্ন হওয়ায় একেবারে বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। বরং অনুষ্ঠানের মান, সংবাদ পরিবেশনের পদ্ধতি, সৃজনশীলতা, দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেওয়া বেশি জরুরি। 

দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনেও একই ধরনের মত পাওয়া যায়। টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব খ. ম. হারুন ঐতিহাসিক লোগো রেখে সেটিকে আরও আকর্ষণীয় করার কথা বলেছেন এবং অনুষ্ঠান, প্রশিক্ষণ, কর্মী ব্যবস্থাপনা ও সৃজনশীলতার সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন।

আসল সংকট কোথায়?

এখানেই বিতর্কটি লোগোর বাইরে গিয়ে বিটিভির বৃহত্তর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

বাংলাদেশের মিডিয়া বাজারে এখন অসংখ্য বেসরকারি টেলিভিশন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইউটিউব চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট নির্মাতা সক্রিয়। দর্শকের সামনে বিকল্পের অভাব নেই। ফলে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দর্শক কেন বিটিভি দেখবেন?

বিটিভির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম কেন্দ্রসহ ১৪টি উপকেন্দ্র/রিলে কেন্দ্রের মাধ্যমে এর সম্প্রচার সুবিধা রয়েছে এবং প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ টেরেস্ট্রিয়াল সম্প্রচারের আওতায় রয়েছে।

অর্থাৎ বিটিভির সবচেয়ে বড় সম্পদ এখনও তার reach—দেশের বিস্তৃত অঞ্চলে পৌঁছানোর সক্ষমতা।কিন্তু পৌঁছাতে পারা আর দর্শক ধরে রাখা এক জিনিস নয়।

প্রথম আলোর সাম্প্রতিক একটি আলোচনায়ও বিটিভির ভবিষ্যৎ নিয়ে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, তার মধ্যে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, বহুমতের প্রতিফলন এবং পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টিংয়ের আদলে প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন।

এখানেই লোগো বিতর্ক একটি বড় প্রশ্নের দরজা খুলে দেয়:বিটিভির কি নতুন লোগো প্রয়োজন, নাকি নতুন দর্শন?

লোগো বদল বনাম লোগো সংস্কার

ব্র্যান্ড বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে পুরোনো একটি লোগো পরিবর্তনের অন্তত তিনটি পথ থাকতে পারে।

প্রথমত, সম্পূর্ণ নতুন পরিচয় তৈরি করা।

দ্বিতীয়ত, মূল প্রতীক অপরিবর্তিত রেখে টাইপফেস, অনুপাত, ডিজিটাল ব্যবহারের উপযোগিতা, অ্যানিমেশন ও এইচডি স্ক্রিনের জন্য ভিজ্যুয়াল রিফ্রেশ করা।

তৃতীয়ত, মূল লোগোকে ‘heritage mark’ হিসেবে রেখে আলাদা আধুনিক সাব-ব্র্যান্ড বা ডিজিটাল পরিচয় তৈরি করা।

বিটিভির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বা তৃতীয় মডেলটি বিতর্ক কমাতে পারে—এমন একটি সম্ভাবনা বিবেচনার দাবি রাখে। এতে আধুনিকতার প্রয়োজন মেটানো সম্ভব, আবার ঐতিহাসিক প্রতীকও অক্ষুণ্ণ রাখা যায়।

ইতিহাস মুছে নয়, ইতিহাসকে সঙ্গে নিয়েই আধুনিকায়ন

বিটিভির ইতিহাস কেবল একটি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলের ইতিহাস নয়। ১৯৬৪ সালের সম্প্রচার শুরুর পর এটি পূর্ব পাকিস্তানের টেলিভিশন থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে রূপান্তরের সাক্ষী। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রগঠন, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং বাংলাদেশের জনপ্রিয় টেলিভিশন সংস্কৃতির বহু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত এর আর্কাইভে জমা রয়েছে। তাই লোগো পরিবর্তনের প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্তত তিনটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে:

এক. ঐতিহাসিক প্রতীকটির সাংস্কৃতিক মূল্য।

দুই. নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে বিটিভিকে প্রাসঙ্গিক করার প্রয়োজন।

তিন. প্রতিষ্ঠানটির অনুষ্ঠান, সংবাদ, ডিজিটাল কনটেন্ট, প্রযুক্তি, জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার কাঠামোগত সংস্কার।

শুধু তৃতীয়টি বাদ দিয়ে প্রথম দুটির ওপর কাজ করলে পরিবর্তনটি হয়তো চোখে পড়বে; কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির মৌলিক সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে।

রাজনৈতিক সমর্থনের জায়গা থেকে ভিন্ন তাৎপর্য

শায়রুল কবির খানের বক্তব্যের আরেকটি তাৎপর্য রয়েছে রাজনৈতিক পরিসরে। তিনি বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য—অর্থাৎ বর্তমান রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একটি দলের মিডিয়া কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। সেই পক্ষের একজন গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়া-কর্মীর কাছ থেকেই যখন ঐতিহাসিক লোগো ধরে রাখার আহ্বান আসে, তখন এটি নিছক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নস্টালজিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যায়।

তবে এটিকে সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই—যতক্ষণ না সরকার, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বা বিটিভি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে লোগো পরিবর্তন নিয়ে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করছে।

বরং এটিকে বর্তমান রাজনৈতিক পরিসরে ঐতিহ্য বনাম পুনর্গঠন বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

শেষ কথা: নতুন বিটিভির পরিচয় কি পুরোনো প্রতীক নিয়েই সম্ভব?

বিটিভির সামনে এখন যে চ্যালেঞ্জ, তা একটি লোগোর চেয়ে অনেক বড়।

দর্শকের আস্থা ফিরিয়ে আনা, শক্তিশালী সংবাদ বিভাগ তৈরি করা, সৃজনশীল প্রযোজকদের সুযোগ দেওয়া, আর্কাইভ ডিজিটাইজ করা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কার্যকর উপস্থিতি তৈরি করা, তরুণ দর্শকের জন্য নতুন অনুষ্ঠান নির্মাণ এবং একটি আধুনিক পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টিং মডেলের দিকে এগিয়ে যাওয়া—এসবই হতে পারে প্রকৃত রূপান্তরের সূচক।

একটি নতুন লোগো সেই পরিবর্তনের দৃশ্যমান প্রতীক হতে পারে। কিন্তু লোগো নিজে পরিবর্তনের নিশ্চয়তা নয় পুরোনো লোগো রেখে দেওয়া মানেই অতীতে আটকে থাকা নয়। প্রযুক্তি, অনুষ্ঠান, সংবাদ ও উপস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব—ঐতিহাসিক প্রতীকটি অক্ষুণ্ণ রেখেও।

এই কারণেই বিটিভির লোগো নিয়ে বর্তমান বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত ‘লোগো বদলাবে কি বদলাবে না’ নয়।

প্রশ্নটি আরও বড়:

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন কি তার অতীতকে মুছে নতুন হতে চায়, নাকি অতীতের শক্তিকে সঙ্গে নিয়েই নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চায়?

সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত শুধু একটি লোগোর নকশা নির্ধারণ করবে না; এটি নির্ধারণ করতে পারে বিটিভি নিজের ইতিহাসকে কীভাবে দেখে এবং আগামী প্রজন্মের কাছে নিজেকে কীভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে চায়।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর