বিদেশের কারাগারে ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি, দেশে ফেরাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ
বিদেশের বিভিন্ন কারাগারে ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি বন্দি, আইনি সহায়তা ও দেশে ফেরাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করেছে সরকার।
বিদেশের কারাগারে ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি, দেশে ফেরাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ
বিদেশের বিভিন্ন দেশের কারাগার ও আটককেন্দ্রে বর্তমানে ১০ হাজার ৬৬ জন বাংলাদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস ও মিশনগুলোর কাছ থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদে এ তথ্য তুলে ধরেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে যশোর-৫ আসনের বিরোধী দলের সদস্য কাজী এনামুল হকের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বিদেশে গ্রেপ্তার ও কারাভোগ করা বাংলাদেশি নাগরিকরা সংশ্লিষ্ট দেশের প্রচলিত আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় থাকেন। তাই তাদের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান রেখেই কূটনৈতিকভাবে কাজ করতে হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কোনো বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশে কারাগারে বা আটককেন্দ্রে থাকার খবর পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি দূতাবাস বা মিশন বিষয়টি নিয়ে সক্রিয় হয়। মিশনের কর্মকর্তারা কারাগার বা আটককেন্দ্র পরিদর্শন করে বন্দির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তার মামলা, অবস্থান ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেন। এরপর মামলাসংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং আইনি সুরক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
কোনো বন্দির নিজস্ব আইনজীবী নিয়োগের আর্থিক সক্ষমতা না থাকলে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি মিশন আদালতের মাধ্যমে আইনজীবী নিয়োগের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করে। আবার কোনো বন্দির পরিবার নিজস্ব আইনজীবী নিয়োগ করতে চাইলে মিশনের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হয়।
শুধু আইনি সহায়তাই নয়, কারাদণ্ড বা মামলার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশি নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনতেও সহযোগিতা করে সরকার। কোনো ক্ষেত্রে জরিমানা পরিশোধের প্রয়োজন হলে বন্দির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হয়। একইভাবে দেশে ফেরার জন্য বিমানের টিকিটের ব্যবস্থাও করা হয়।
পরিবার যদি দেশে ফেরানোর খরচ বহন করতে না পারে, সেক্ষেত্রে সরকারি অর্থে প্রত্যাবাসনের ব্যয় বহনের ব্যবস্থাও করা হয় বলে সংসদে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। দেশে ফেরার সময় বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় প্রটোকলসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতাও সম্পন্ন করতে সহায়তা দেওয়া হয়।
কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের দ্রুত দেশে ফেরানোর জন্য ট্রাভেল পাস ইস্যুতেও সহায়তা করে সংশ্লিষ্ট মিশনগুলো। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকলে দেশে ফেরার প্রক্রিয়া যাতে আটকে না যায়, সে বিষয়েও মিশনগুলো কাজ করে থাকে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সাধারণ ক্ষমা বা বিশেষ ছাড় পাওয়ার জন্যও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হয়। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আটক বাংলাদেশিদের পাশাপাশি মিয়ানমারে আটক তিন বাংলাদেশি জেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও এ ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও সমন্বিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শিগগির একটি বিশেষ পোর্টাল চালু করবে বলেও জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এই পোর্টালের মাধ্যমে বিদেশে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিদেশের কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের সংখ্যা নিয়ে এর আগেও সংসদে তথ্য দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ২৬টি দেশের কারাগারে ৯ হাজার ৩৭০ জন বাংলাদেশি ছিলেন।
নতুন তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিভিন্ন দেশে আটক বা কারাগারে থাকা বাংলাদেশির সংখ্যা ১০ হাজার ৬৬ জনে পৌঁছেছে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সংসদীয় বক্তব্যে দেশভিত্তিক এই ১০ হাজার ৬৬ জনের বিস্তারিত তালিকা বা কোন দেশে কতজন বাংলাদেশি বন্দি রয়েছেন, তা প্রকাশ করা হয়নি। ফলে মোট সংখ্যাটি বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি মিশনগুলোর সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যের সমন্বিত হিসাব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিকের কারাবন্দি থাকার বিষয়টি প্রবাসী বাংলাদেশিদের আইনি সুরক্ষা, অভিবাসন সচেতনতা এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আইন মেনে চলার গুরুত্বকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে আটক বাংলাদেশিদের যথাযথ আইনি সহায়তা দেওয়া এবং সাজা শেষে তাদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।