বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পথে, সহায়তা থেকে বঞ্চিত কোটি কোটি মানুষ
বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থায়ন কমে যাওয়া, বিভিন্ন ধরনের চাপ বৃদ্ধি এবং বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দিতে সরকারের ব্যর্থতার কারণে পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সরকারগুলোই বেসামরিক মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক নতুন প্রতিবেদনে এ সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত বছর ৬ কোটি ৪০ লাখ কম মানুষ মানবিক সহায়তা পেয়েছেন
বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পথে, সহায়তা থেকে বঞ্চিত কোটি কোটি মানুষ
বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থায়ন কমে যাওয়া, বিভিন্ন ধরনের চাপ বৃদ্ধি এবং বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দিতে সরকারের ব্যর্থতার কারণে পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সরকারগুলোই বেসামরিক মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক নতুন প্রতিবেদনে এ সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত বছর ৬ কোটি ৪০ লাখ কম মানুষ মানবিক সহায়তা পেয়েছেন।
‘স্টেট অব দ্য হিউম্যানিটারিয়ান সিস্টেম ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মানবিক সহায়তায় অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। এ সময়ে হাজার হাজার মানবিক সহায়তাকর্মী চাকরি হারিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা ব্যবস্থার ইতিহাসে এটি অন্যতম বড় সংকোচন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মানবিক সহায়তার মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় শুধু জীবন বাঁচানোর মতো জরুরি পরিস্থিতিতে থাকা মানুষ। দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা মোকাবিলা এবং সংকট থেকে পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য দেওয়া সহায়তা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়।
মানবিক সহায়তা বিষয়ক সংস্থা অ্যাক্টিভ লার্নিং নেটওয়ার্ক ফর অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যান্ড পারফরম্যান্স -এর তৈরি প্রতিবেদনের সহলেখক জেনিফার ডোহার্টি বলেন, সহায়তা সংকোচনের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়েনি। অর্থায়ন কমে যাওয়া এবং রাজনৈতিক বিধিনিষেধের কারণে নারী, শিশু, প্রবীণ ও বাস্তুচ্যুত মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ডোহার্টির হিসাবে, ২০২৫ সালে মানবিক সহায়তা খাতে কর্মীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে থাকতে পারে। এর ফলে বিশেষায়িত বিভিন্ন সেবা বন্ধ হয়ে গেছে এবং নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মানবিক সহায়তার পরিমাণ আনুমানিক ৩৩.৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ২০২২ সালে এই অর্থের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ৪৭.৫ বিলিয়ন ডলার।
সবচেয়ে বড় কাটছাঁট হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি -এর সহায়তায়। ২০২৫ সালে সংস্থাটির অর্থায়ন ৫৫ শতাংশ কমে যায়। একই সময়ে শীর্ষ ২০ দাতা দেশের মধ্যে ১৩টি তাদের সহায়তা কমিয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মানবিক সহায়তার অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হবে, সে বিষয়ে বিভিন্ন সরকার ক্রমবর্ধমানভাবে চাপ প্রয়োগ করছে। এর উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের এমন কিছু কর্মসূচির অর্থায়ন স্থগিতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলোকে বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তি বা ডিইআই নীতিনির্ভর হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
সহায়তা কমে যাওয়ায় যারা সহায়তা পেয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ অর্থও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২১ সালে একজন সহায়তাপ্রাপ্ত মানুষের জন্য লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক অর্থ ছিল গড়ে ১৭৮ ডলার। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৯০ ডলারে। অথচ ওই সময় একজন মানুষের প্রয়োজনীয় সহায়তার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় আনুমানিক ২৫৫ ডলারে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বেসামরিক মানুষ ও মানবিক সহায়তাকর্মীদের নিরাপত্তা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার ৬৪ শতাংশের জন্য রাষ্ট্রগুলো দায়ী ছিল। বিমান হামলাসহ বিভিন্ন সামরিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানবিক সহায়তাকর্মীদের ওপর সহিংসতার ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রগুলোর বড় ভূমিকা ছিল।
সহায়তা কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি ইয়েমেন। সেখানে পুষ্টির পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে এবং টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত হওয়ায় ডিপথেরিয়ার ঘটনা বেড়েছে।
ইয়েমেনে অ্যাকশন ফর হিউম্যানিটির কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ বাহাশওয়ান বলেন, সহায়তার মাত্রা কমে যাওয়ায় পরিবারগুলোর সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। তাঁর মতে, একটি পরিবার একই সঙ্গে আয় হারাতে পারে, খাবার কিনতে না পারে, অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর দেখভাল করতে পারে এবং স্বাস্থ্যসেবা নিতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার খরচ বহনেও অক্ষম হতে পারে।
প্রতিবেদনে অবশ্য বলা হয়েছে, মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা এখনও সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনের মধ্যে থাকা মানুষদের সহায়তায় কিছু ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে সাড়া দিচ্ছে। স্থানীয় সহায়তা সংস্থা ও প্রবাসী জনগোষ্ঠীর নেটওয়ার্কগুলো অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা এসব নেটওয়ার্কের সঙ্গে যথেষ্ট সমন্বয় করতে পারছে না। বরং অর্থায়ন কমে যাওয়ার কারণে স্থানীয় সংস্থা ও তাদের কর্মীরাই অনেক ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ভিয়েনাভিত্তিক গ্রাউন্ড ট্রুথ সলিউশন্স-এর প্রধান নির্বাহী মেগ স্যাটলার বলেন, স্থানীয় পর্যায়ের সংস্থাগুলোর ভূমিকা আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে যথেষ্ট মানিয়ে নিতে পারেনি এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা অর্থায়ন-সংক্রান্ত শর্ত ও কাটছাঁটের বিরুদ্ধে পর্যাপ্তভাবে অবস্থান নিতে পারেনি।
তিনি বলেন, সহায়তা সংকোচনের কারণে অনেক মানুষ এখন গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। কারণ সহায়তা কেবল ‘জীবন রক্ষাকারী’ কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। এর ফলে সন্তানদের স্কুলে পাঠানো কিংবা ভবিষ্যতে আয় করার জন্য ছোট ব্যবসা শুরু করতে সঞ্চয় করার মতো বিষয়গুলোও অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে—যে সুযোগগুলো মানুষকে ভবিষ্যতে মানবিক সহায়তার ওপর কম নির্ভরশীল হতে সাহায্য করতে পারত।
প্রতিবেদন : দ্য গার্ডিয়ান