ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ কি আফগানিস্তান-ইরাকের মতো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে যাচ্ছে?
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ছয় মাসে গড়িয়েছে, শেষের পথ অনিশ্চিত; হরমুজে উত্তেজনা বাড়ায় বিশ্বজুড়ে তেল ও অর্থনীতিতে চাপ।
ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ কি আফগানিস্তান-ইরাকের মতো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে যাচ্ছে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার আগে নিজেকে যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে থাকা নেতা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশের দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সংঘাত থেকে দূরে রাখা। কিন্তু ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ এখন সেই অবস্থানের বিপরীত একটি বাস্তবতা তৈরি করেছে। রয়টার্সের ১০ সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ছয় মাসের সামরিক অভিযান আফগানিস্তান ও ইরাকের পর আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’-এ পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অভিযান আগের আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের মতো পুরোপুরি একই ধরনের নয়। এবার ওয়াশিংটন বড় আকারে স্থলসেনা পাঠিয়ে কোনো দেশের ভূখণ্ড দখল করে রাখার পরিবর্তে মূলত বিমান ও নৌ শক্তি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সামুদ্রিক অবরোধের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করছে। তবু ছয় মাস পরও ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাত হয়নি এবং দেশটির পরমাণু কর্মসূচিও পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ কারণেই যুদ্ধের লক্ষ্য এবং যুদ্ধ শেষ করার কৌশল নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। কোনো সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে শুরুতে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা গেলেও সেই লক্ষ্য অর্জনের পর কীভাবে সংঘাত শেষ করা হবে, সেটি অনেক সময় সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ইরানের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির বিশ্লেষক সিনা তুসির বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, ইরানের বিরুদ্ধে এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রে ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের পর তৈরি হওয়া আরেকটি বড় ও অনির্দিষ্টকালীন মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে না জড়ানোর রাজনৈতিক বাধা দুর্বল করে দিয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, এর ফলে ট্রাম্পের পরবর্তী প্রেসিডেন্টের জন্যও একটি দীর্ঘস্থায়ী যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত উত্তরাধিকার হিসেবে থেকে যেতে পারে।
আফগানিস্তান ও ইরাকের অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরু হয়েছিল। এরপর ২০০৩ সালে ইরাকে আক্রমণ করে যুক্তরাষ্ট্র। দুটি যুদ্ধেরই শুরুতে নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্য ছিল। কিন্তু পরে সেখানে বিদ্রোহ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক সংঘাত যুক্ত হওয়ায় মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি দীর্ঘায়িত হয়।
ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির ওপরও বড় চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে বিপুল অর্থ ব্যয়, প্রাণহানি এবং রাজনৈতিক বিতর্ক মার্কিন সমাজে বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে বিরূপ মনোভাব বাড়িয়ে দেয়। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধগুলোর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াই পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পের মতো একজন নেতার উত্থানের পেছনে ভূমিকা রেখেছিল।
কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইরান একটি বড় রাষ্ট্র, যার নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা রয়েছে। দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যবস্থার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ইরানের সামরিক অবকাঠামোর ওপর আঘাত হানলেও সংঘাতের অন্য অংশগুলো সক্রিয় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ চললেও ইরান সীমিত পরিমাণে নতুন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করছে বলে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ইরান বিদ্যমান উপাদান ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। এই তথ্য ইঙ্গিত করে যে যুদ্ধের মধ্যেও ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি অচল হয়ে যায়নি।
এদিকে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। এই জলপথ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি। সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নয়, বিশ্বের বহু দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক বাজার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। একই সময়ে বিশ্ববাজারে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগও বেড়েছে।
তেলের দাম বাড়ার অর্থ শুধু পেট্রোল বা ডিজেলের দাম বাড়া নয়। জ্বালানি পরিবহনের খরচ বাড়লে খাদ্য, পোশাক, শিল্পপণ্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে এর প্রভাব আরও বেশি হতে পারে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব হরমুজ প্রণালির বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে। লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দাব প্রণালিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান-সমর্থিত হুথিরা ইয়েমেনের মোখা বন্দর দখল করেছে এবং লোহিত সাগরের উপকূলের আরও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
বাব আল-মান্দাব এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। এই পথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হয়। এতে পরিবহন সময় ও ব্যয় দুটিই বাড়ে। ফলে ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায়ও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্যও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বাড়ছে। সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই মার্কিন জনগণের মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় এই বিষয়টি রিপাবলিকান দলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে যদি জ্বালানি মূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে, তাহলে সেটি ভোটারদের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বাজারেও যুদ্ধের প্রভাব স্পষ্ট। রয়টার্সের ১০ সেপ্টেম্বরের বাজার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারেও চাপ তৈরি হয়। ইউরোপে জ্বালানি মূল্যও বাড়তে থাকে এবং মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা নতুন করে জোরালো হয়।
এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিতেও পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। কারণ তেলের দাম দীর্ঘদিন বেশি থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যায়। একই সঙ্গে ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়ে। ফলে যুদ্ধটি সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকটের কারণেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ইরাকের পরিস্থিতিও ইরান যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদির জন্য ইরান-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির বিরোধিতা করে।
এতে বোঝা যায়, ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত শুধু একটি দেশ ও একটি সামরিক বাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইরাক, ইয়েমেন, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ—সবকিছুই এই সংঘাতের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। আর এখানেই ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’-এর আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। যদি প্রতিটি সামরিক হামলার পর পাল্টা হামলা হয়, একটি অঞ্চলের সংঘাত অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং কোনো পক্ষই রাজনৈতিক সমঝোতায় যেতে না চায়, তাহলে যুদ্ধের শেষ নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে যায়।
তবে এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে ইরান যুদ্ধ আফগানিস্তান বা ইরাকের মতো বহু বছর ধরে চলবে। রয়টার্সের প্রতিবেদনও এমন কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী করেনি। বরং বিশ্লেষকদের বক্তব্য হলো, বর্তমান পরিস্থিতিতে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি যথেষ্ট বড়।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—সামরিকভাবে কতটা চাপ প্রয়োগ করা হবে এবং কোন পর্যায়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথে যাওয়া হবে। কারণ সামরিক শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা সম্ভব হলেও রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মহলে ছিল, সেটি বাস্তবে কতটা সম্ভব। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ছয় মাসের সামরিক অভিযানের পরও ইরানের সরকার টিকে আছে এবং দেশটির পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।
এর অর্থ হলো, যুদ্ধের শুরুতে যে দ্রুত ফল পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন যুদ্ধের মেয়াদ। কারণ যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তত বেশি সামরিক ব্যয় হবে, তত বেশি অস্ত্র ও জনবল প্রয়োজন হবে এবং তত বেশি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে। এর সঙ্গে যদি হরমুজ বা বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে বাধা অব্যাহত থাকে, তাহলে সংকটের প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।
বিশ্বের জন্য তাই ইরান যুদ্ধ এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি সামরিক সংঘাত নয়। এটি তেলের বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, মূল্যস্ফীতি, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক রাজনীতির ওপর প্রভাব ফেলছে। ভারতও আগামী ১২–১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজন করছে, যেখানে ইরান যুদ্ধের কারণে জোটের অভ্যন্তরীণ ঐক্যও বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।
শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ সত্যিই আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী মার্কিন যুদ্ধে পরিণত হবে কি না, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক মাসের সামরিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি যে ওয়াশিংটনের জন্য সহজ বিজয়ের গল্প নয়, তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
ট্রাম্পের জন্য এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক সাফল্য দেখানোই যথেষ্ট নয়। তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে এই সংঘাতের একটি বাস্তবসম্মত সমাপ্তিও রয়েছে। কারণ আফগানিস্তান ও ইরাকের অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রকে যে শিক্ষা দিয়েছে, সেটি হলো—যুদ্ধ শুরু করা যতটা সহজ, একটি যুদ্ধকে সম্মানজনক, স্থায়ী ও রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্যভাবে শেষ করা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।