জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর বক্তব্য ঘিরে উত্তেজনা, গ্রেপ্তারের দাবিও সামনে
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য বক্তব্য ঘিরে নিউইয়র্কে রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিক্ষোভ ও গ্রেপ্তারের দাবি নিয়ে বাড়ছে আলোচনা।
জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর বক্তব্য ঘিরে উত্তেজনা, গ্রেপ্তারের দাবিও সামনে
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়া ঘিরে নিউইয়র্কে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের বার্ষিক সাধারণ বিতর্কে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর নেতানিয়াহুর বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে প্রায় ২৪ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত সফর করবেন। তিনি ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেবেন এবং সেদিন রাতেই ইসরায়েলে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে তাঁর এই সফরকে কেন্দ্র করে শুধু কূটনৈতিক পর্যায়েই নয়, নিউইয়র্কের রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। গাজা যুদ্ধ এবং নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক চলছে। এবার জাতিসংঘের অধিবেশনে তাঁর উপস্থিতি সেই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি এর আগে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের আহ্বান জানিয়েছিলেন। পরে তিনি স্বীকার করেন, নিউইয়র্ক শহরের নিজস্ব আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়নের এখতিয়ার নেই। তবে মামদানি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারকে বিষয়টি কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০২৪ সালের নভেম্বরে নেতানিয়াহু ও তৎকালীন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। আদালত বলেছিল, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সময় বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের বিষয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো ভিত্তি রয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে মানবিক সহায়তা সীমিত করে ক্ষুধাকে যুদ্ধের পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। ইসরায়েল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল—দুই দেশই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য নয়। ফলে নিউইয়র্কে নেতানিয়াহুর উপস্থিতি থাকলেই শহরের পুলিশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পরোয়ানা কার্যকর করতে পারবে—এমনটি নয়। নিউইয়র্ক শহরের মেয়রও পরে এই আইনি সীমাবদ্ধতার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন মামদানির অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের আহ্বান রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি একই সঙ্গে বলেছেন, নেতানিয়াহুর জন্য জাতিসংঘের মঞ্চে উপস্থিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ এবং বিভিন্ন ধরনের বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি বক্তব্য দেবেন।
নেতানিয়াহুর সফরকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে সম্ভাব্য বিক্ষোভ নিয়েও আলোচনা চলছে। ইসরায়েলি কূটনীতিকরা আশঙ্কা করছেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিক্ষোভ হতে পারে। গত বছরও তাঁর বক্তব্যের সময় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাকক্ষে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের একটি বড় অংশ প্রতিবাদ জানিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল।
এবার পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হওয়ার কারণ হিসেবে গাজা যুদ্ধকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মতবিরোধ, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি নিয়ে বিভিন্ন দেশের অবস্থান এবং ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্রমবর্ধমান সমালোচনার বিষয়গুলো সামনে এসেছে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় চলছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন ইসরায়েল নির্বাচনী প্রচারণার দিকে এগোচ্ছে। ফলে জাতিসংঘের মঞ্চে নেতানিয়াহুর বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনীতির পাশাপাশি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে গাজা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক আইনি চাপও অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিষয়টি আলাদা হলেও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজা-সংক্রান্ত মামলাও চলছে। একই সময়ে জার্মানির বিরুদ্ধে ইসরায়েলকে অস্ত্র সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে শুনানি হয়েছে। জার্মানি অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের পর থেকে গাজায় ব্যবহারের জন্য তারা কোনো অস্ত্র রপ্তানির অনুমোদন দেয়নি এবং অস্ত্র রপ্তানির বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, আদালতের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা সতর্ক করেছেন যে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য না হলেও আদালতের কার্যক্রম নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং আদালতের কয়েকজন কর্মকর্তা ও বিচারকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছে।
ফলে ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহুর বক্তব্য এখন শুধু একটি নিয়মিত কূটনৈতিক ভাষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। গাজা যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, ফিলিস্তিন প্রশ্ন, নিউইয়র্কে সম্ভাব্য বিক্ষোভ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর এবারের জাতিসংঘ সফর আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে উঠতে পারে।