ইয়েমেনের মোখা দখলে হুতিরা, বাব আল-মান্দাব ঘিরে নতুন শঙ্কা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে চাপ
ইয়েমেনের মোখা বন্দরনগরী দখলে নিল হুতিরা, বাব আল-মান্দাব ঘিরে বাড়ল শঙ্কা, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে নতুন চাপ তৈরি হলো আবার।
ইয়েমেনের মোখা দখলে হুতিরা, বাব আল-মান্দাব ঘিরে নতুন শঙ্কা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে চাপ
ইয়েমেনের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধারা। বৃহস্পতিবার ১০ সেপ্টেম্বরের এই ঘটনা ইয়েমেনের চলমান সংঘাতকে নতুন মাত্রা দেওয়ার পাশাপাশি লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একই দিনে মধ্যপ্রাচ্যের জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও দ্রুত বেড়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান-ঘনিষ্ঠ হুতিরা ইয়েমেনের মোখা শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে তাদের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। মোখা বাব আল-মান্দাব প্রণালীর কাছাকাছি অবস্থিত। এই প্রণালী লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোখা বাব আল-মান্দাব থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে। হুতিদের হাতে শহরটির নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার বিষয়টি হুতি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হাজেম আল-আসাদ এবং ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে থাকা ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সের কমান্ডার আহমেদ বাশ—দুই পক্ষই নিশ্চিত করেছেন। ফলে এটি শুধু একটি পক্ষের দাবি নয়; দুই পক্ষের বক্তব্যেই শহরটির নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে এসেছে।
মোখা ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক বন্দরনগরী। এর অবস্থান সামরিক ও নৌ-নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শহরটির নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে যাওয়ায় তারা লোহিত সাগরের দক্ষিণাংশে জাহাজ চলাচলের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে বাব আল-মান্দাব প্রণালীকে ঘিরে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন হয়। এপি জানিয়েছে, সাধারণ সময়ে বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ তেল ও অন্যান্য পণ্য এই অঞ্চলের নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। এর ফলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি হলে জাহাজ কোম্পানিগুলোকে দীর্ঘতর বিকল্প পথে যেতে হতে পারে, যার ফলে পরিবহন ব্যয় ও পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে এর প্রভাব দেখা গেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ দশমিক ২৬ ডলারে পৌঁছেছিল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দামও ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। মে মাসের পর এই প্রথম ডব্লিউটিআইয়ের দাম ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করে।
তেলের বাজারে এই অস্থিরতা শুধু মোখা দখলের কারণে তৈরি হয়নি। একই সময়ে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতেও জাহাজ চলাচল নিয়ে বড় ধরনের উত্তেজনা চলছে। ফলে বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ—হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব একই সময়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় চাপ তৈরি হতে পারে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহে তেলের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত, উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজে হামলা এবং সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা। বৃহস্পতিবারের নতুন উত্তেজনা বাজারের সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইয়েমেনে হুতিদের এই অগ্রযাত্রা দেশটির অভ্যন্তরীণ সংঘাতকেও নতুন করে উত্তপ্ত করে তুলেছে। ২০২২ সালের পর ইয়েমেনে তুলনামূলকভাবে যে যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে সেটি আবার ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। হুতিদের সঙ্গে ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর পাশাপাশি সৌদি আরব-সমর্থিত বাহিনীর সংঘর্ষও বেড়েছে।
এপি জানিয়েছে, মোখা দখলের পর ইয়েমেন সরকারের পক্ষে থাকা বাহিনী হুতিদের অবস্থানের বিরুদ্ধে পাল্টা বিমান হামলা চালিয়েছে। তায়েজ প্রদেশে হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে হোদেইদার দক্ষিণাঞ্চলেও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। ফলে মোখা দখলকে কেন্দ্র করে সামরিক উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মোখা শহর থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের পালিয়ে যাওয়ার খবরও এসেছে। এপি জানিয়েছে, শহরে হুতিদের ব্যাপক উপস্থিতি, সড়ক বন্ধ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে কিছু বাসিন্দা নিরাপদ এলাকায় চলে গেছেন। চিকিৎসকরাও শহর ছেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর ফলে সংঘাতের সামরিক প্রভাবের পাশাপাশি মানবিক সংকটও বাড়তে পারে।
এদিকে হুতিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা বাড়ছে। হুতিদের দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও সমর্থিত গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে হুতিদের প্রতিটি সামরিক সিদ্ধান্ত সরাসরি ইরানের নির্দেশে হয়েছে—এমন দাবি নিশ্চিতভাবে করা যায় না। তাই সংবাদ প্রতিবেদনে তাদের ইরান-সমর্থিত বা ইরান-ঘনিষ্ঠ হুতি বাহিনী হিসেবে উল্লেখ করাই তথ্যগতভাবে বেশি সতর্ক ও গ্রহণযোগ্য।
মোখা দখলের ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের উত্তেজনাও তীব্র হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নভেম্বরের যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই শেষ হবে বলে তিনি আশা করছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের বক্তব্যের সময় তিনি দাবি করেন, ইরান মার্কিন নির্বাচনে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের মুখে তেহরান দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারবে না।
তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে যুদ্ধ শেষ হওয়ার নিশ্চিত ঘোষণা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। এটি তার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মূল্যায়ন। রয়টার্সের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। একই সময়ে মার্কিন প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে ইরানের সঙ্গে সংঘাত নিয়ে আলোচনা চলছে।
এই অবস্থায় ইয়েমেনে হুতিদের নতুন অগ্রযাত্রা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক দিক হয়ে উঠেছে। কারণ হুতিরা যদি বাব আল-মান্দাবের আশপাশের সামুদ্রিক এলাকায় আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে, তাহলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
জাহাজ কোম্পানিগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নিরাপত্তা। কোনো নির্দিষ্ট নৌপথে হামলার আশঙ্কা বাড়লে জাহাজগুলোকে বিকল্প দীর্ঘতর পথে পাঠানো হতে পারে। এতে জ্বালানি খরচ, বীমা ব্যয় এবং পণ্য পরিবহনের সময় বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব ভোক্তা পর্যায়েও পড়তে পারে। বিশেষ করে তেল, গ্যাস, খাদ্য ও শিল্পপণ্যের আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় যুক্ত হতে পারে।
এদিকে তেলের বাজারে ইতোমধ্যেই সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে আগস্টে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক জোটের উৎপাদনও কমেছে। একই সঙ্গে ইরানের তেল রপ্তানি ও সৌদি আরবের তেল সরবরাহে বিঘ্নের প্রভাব বাজারে পড়ছে। ফলে মোখা ও বাব আল-মান্দাবকে ঘিরে নতুন কোনো বড় ধরনের নৌ-সংকট তৈরি হলে তেলের বাজারে চাপ আরও বাড়তে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এর অর্থ হলো জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে। বিমান পরিবহন, পণ্যবাহী ট্রাক, জাহাজ, কারখানা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে থাকলে বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে।
তবে মোখা দখল মানেই বাব আল-মান্দাব প্রণালী পুরোপুরি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে—এমন দাবি এখনই করা যাবে না। শহরটির কৌশলগত অবস্থান হুতিদের সামরিক সুবিধা বাড়িয়েছে, কিন্তু পুরো প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ একটি আলাদা বিষয়। এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতিকে বাব আল-মান্দাবের ওপর বাড়তি চাপ ও ঝুঁকি হিসেবে বর্ণনা করা বেশি নির্ভুল।
ইয়েমেনের মোখা শহর হুতিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে হরমুজ প্রণালী ঘিরে জাহাজ চলাচলে অস্থিরতা, অন্যদিকে বাব আল-মান্দাবের কাছে হুতিদের নতুন অবস্থান—দুটি সংকট একসঙ্গে চলতে থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে ব্রেন্ট তেলের দাম ১০৫ ডলারের ওপরে উঠে যাওয়ায় বাজারের উদ্বেগের মাত্রাও স্পষ্ট হয়েছে।
তবে পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে হুতিরা মোখা ও আশপাশের এলাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণ কতটা ধরে রাখতে পারে, ইয়েমেন সরকারের বাহিনী কী ধরনের পাল্টা অভিযান চালায় এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত কোন দিকে যায় তার ওপর। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয় কি না, সেটিও বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।