নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নরওয়ের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগ চায় বাংলাদেশ, সবুজ অর্থনীতিতে নরওয়ের সহযোগিতা ও প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব বাড়ানোর আহ্বান ঢাকার।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নরওয়ের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নরওয়ের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ


বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নরওয়ের সহযোগিতা ও বড় বিনিয়োগ চেয়েছে বাংলাদেশ। দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক আলোচনায় সৌরবিদ্যুৎ, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং সবুজ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

২০২৬ সালের ২ জুন বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকোন আরাল্ড গুলব্র্যান্ডসেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশি পক্ষ নরওয়ের উদ্যোক্তাদের দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ ও প্যাকেজিং শিল্পে বড় পরিসরে বিনিয়োগের আহ্বান জানায়।

বাংলাদেশের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। আমদানি করা জ্বালানির দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ওঠানামা করায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়েও প্রভাব পড়ে। এ অবস্থায় সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি এবং অন্যান্য পরিবেশবান্ধব জ্বালানির উৎপাদন বাড়াতে পারলে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য তৈরি হতে পারে।

নরওয়ের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রে অর্থায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নরওয়ের উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান নরফান্ড ইতোমধ্যে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও অংশীদারত্ব নিয়ে কাজ করছে। ২০২৬ সালের ১৪ মে অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি লিমিটেডের আয়োজনে ঢাকায় একটি গোলটেবিল বৈঠকে নরওয়ের দূতাবাস, নরফান্ড এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের উদ্যোক্তারা অংশ নেন। বৈঠকের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরকে দ্রুততর করতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও কৌশলগত অংশীদারত্বের সুযোগ খুঁজে বের করা।

এর আগে ২০২৫ সালেও বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কার্বন বাজারে বড় বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছিল নরওয়ে। ছোট আকারের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কার্বন বাজার এবং কৃষি বনায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। একই সময়ে বাংলাদেশ নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির সম্ভাবনাও অনুসন্ধান করছিল।

নরওয়ের সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তি ও দক্ষতা বিনিময়। নরওয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবিদ্যুৎ, সামুদ্রিক প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দেশ। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি খাতে তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যাপক ব্যবহার আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগের অন্যতম ভিত্তি।

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনাও বড়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, শিল্পকারখানায় সৌরবিদ্যুৎ এবং বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। নরওয়ের অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা পাওয়া গেলে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন আরও গতিশীল হতে পারে।

শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; উৎপাদিত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে কার্যকরভাবে যুক্ত করার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো, গ্রিডের সক্ষমতা, শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা—সবগুলো বিষয় একই সঙ্গে উন্নত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে নীতিগত স্থিতিশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাত নিয়ে আলোচনায় বিনিয়োগকারীরা বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, গ্রিড ব্যবহারের মাশুল, গ্রিড ক্ষতির হিসাব, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং প্রণোদনা বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। নরওয়ের রাষ্ট্রদূতও বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তরকে পরিবেশের পাশাপাশি টেকসই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

বাংলাদেশের জন্য নরওয়ের সঙ্গে সহযোগিতা তাই শুধু বিদেশি অর্থ পাওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে নতুন প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল তৈরি, পরিবেশবান্ধব শিল্পের প্রসার এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি আমদানির ওপর চাপ কমানোর সুযোগ।

দুই দেশের সম্পর্কের পরিধিও ধীরে ধীরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের দিকে বিস্তৃত হচ্ছে। ২০২৬ সালের আলোচনায় নরওয়ের রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেছেন, নরওয়ে আগের মতো শুধু উন্নয়ন সহযোগিতার ওপর নির্ভর না করে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের দিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশও এই পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সবুজ প্রযুক্তিতে নরওয়ের বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চাইছে।

বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নরওয়ের সম্ভাব্য সহযোগিতা দেশের জ্বালানি রূপান্তরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত করতে বিনিয়োগের পাশাপাশি স্বচ্ছ নীতিমালা, দ্রুত অনুমোদন, নির্ভরযোগ্য গ্রিড অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব শর্ত পূরণ করা গেলে বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে নরওয়ের বিনিয়োগ ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর