ডালাসে ট্রাম্প, শুরু রিপাবলিকানদের প্রথম জাতীয় মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্মেলন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডালাসে পৌঁছেছেন, যেখানে রিপাবলিকান পার্টি প্রথমবারের মতো মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় পর্যায়ের বিশেষ সম্মেলন আয়োজন করেছে।

ডালাসে ট্রাম্প, শুরু রিপাবলিকানদের প্রথম জাতীয় মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্মেলন

ডালাসে ট্রাম্প, শুরু রিপাবলিকানদের প্রথম জাতীয় মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্মেলন


যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সাধারণত জাতীয় রাজনৈতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বছর। কিন্তু এবার সেই প্রচলিত রীতি থেকে বেরিয়ে এসে রিপাবলিকান পার্টি ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ডালাসে বিশেষ জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করেছে। দলটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, এটি মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রিপাবলিকানদের প্রথম এমন সম্মেলন।ডালাসের আমেরিকান এয়ারলাইনস কেন্দ্রে ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, রিপাবলিকান পার্টির শীর্ষ নেতা, আইনপ্রণেতা এবং বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার প্রার্থীরা অংশ নিচ্ছেন। ট্রাম্প সম্মেলনের দুই রাতেই বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে, আর ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স দ্বিতীয় রাতে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেবেন। 

এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হলো নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান ভোটারদের সক্রিয় করা। ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হতে যাচ্ছে। তাই প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য ভোটার সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে দলটি। 

রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সম্মেলনটি শুধু দলীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং ট্রাম্পকে সামনে রেখে পুরো রিপাবলিকান নির্বাচনী প্রচারণাকে আরও সক্রিয় করার একটি কৌশল। কারণ মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের নাম সাধারণত ব্যালটে থাকে না। ফলে ক্ষমতাসীন দলের ভোটার উপস্থিতি ধরে রাখা ঐতিহাসিকভাবেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

ট্রাম্পের জন্য এবারের সম্মেলন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তার রাজনৈতিক প্রভাবকে আগামী নভেম্বরের নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার কারণে। সম্মেলনের প্রথম রাতে দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি রিপাবলিকানদের নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান এবং ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, যেন তারা তাকে প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করে নির্বাচনে অংশ নেন।

সম্মেলনে অর্থনীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জাতীয় নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা এবং সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে রিপাবলিকানদের অবস্থান তুলে ধরা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী আসনের প্রার্থীদের সামনে আনা হচ্ছে, যাতে জাতীয় পর্যায়ের প্রচারণার সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচনী লড়াইয়ের যোগসূত্র তৈরি করা যায়।

তবে সম্মেলনটি নিয়ে রিপাবলিকান দলের ভেতরেও কিছুটা অস্বস্তি রয়েছে। কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ও প্রার্থী ডালাসের আয়োজন থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিশেষ করে যেসব প্রার্থী নিজেদের অঙ্গরাজ্যে কঠিন নির্বাচনী লড়াইয়ের মুখে রয়েছেন, তাদের কেউ কেউ ট্রাম্পের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে নিজেদের যুক্ত করতে চাইছেন না। 

এর ফলে সম্মেলনটি একদিকে যেমন দলীয় ঐক্য প্রদর্শনের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে তেমনি রিপাবলিকান দলের ভেতরে ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে থাকা মতপার্থক্যও সামনে চলে আসছে। দলীয় নেতৃত্ব অবশ্য সম্মেলনকে ঐক্য ও নির্বাচনী শক্তি প্রদর্শনের একটি বড় সুযোগ হিসেবে তুলে ধরছে।

ডালাসে যাওয়ার পথেও ট্রাম্পের যাত্রায় সাময়িক বিঘ্ন ঘটে। জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে তার ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা নতুন বিমানটির জরুরি নির্গমন সিঁড়ি হঠাৎ সক্রিয় হয়ে যায়। এতে বিমানটি পরীক্ষা ও পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছুটা সময় লাগে এবং ট্রাম্পকে কিছুক্ষণ মেরিন ওয়ান হেলিকপ্টারে অপেক্ষা করতে হয়। 

ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানবাহিনীর একজন সদস্য ভুলবশত জরুরি সিঁড়িটি সক্রিয় করে ফেলেছিলেন। তবে ট্রাম্প বিষয়টিকে বড় কোনো বিপদ হিসেবে দেখাননি। তিনি সাংবাদিকদের জানান, বিমানটির জরুরি ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হচ্ছিল এবং সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না তা নিশ্চিত করা হচ্ছিল। পরে বিমানটি নিরাপদেই ডালাসের উদ্দেশে যাত্রা করে। 

এই বিমানটি কাতার সরকারের দেওয়া নতুন উড়োজাহাজ, যা ট্রাম্পের জন্য সাময়িকভাবে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হয়েছে। এর জরুরি সিঁড়ি সক্রিয় হওয়ার ঘটনাটি তাই আলাদাভাবে সংবাদমাধ্যমের নজর কেড়েছে। তবে ঘটনার কারণে ট্রাম্পের ডালাস সফর বাতিল হয়নি এবং তিনি সম্মেলনে যোগ দেন। 

রিপাবলিকানদের এই সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থ সংগ্রহ ও নির্বাচনী প্রচারণা। দলীয় প্রার্থী ও নেতারা বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার জন্য সমর্থন ও অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক বার্তা আরও জোরালোভাবে ভোটারদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

সম্মেলনের আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই আয়োজনের মাধ্যমে তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের অর্জন তুলে ধরতে, রিপাবলিকান প্রার্থীদের পরিচিত করতে এবং নভেম্বরের নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে চান। দলটি এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন ধরনের আয়োজন হিসেবে উপস্থাপন করছে। 

তবে রিপাবলিকানদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সম্মেলনের রাজনৈতিক উচ্ছ্বাসকে নভেম্বরের ভোটে বাস্তব সমর্থনে পরিণত করা।

 রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্পের অনুমোদন হার তুলনামূলকভাবে দুর্বল এবং অর্থনীতি ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তার প্রশাসন সমালোচনার মুখে রয়েছে। তাই ডালাসের সম্মেলনের মাধ্যমে দলটি সেই রাজনৈতিক চাপ কাটিয়ে নিজেদের ভোটারদের আবার সক্রিয় করার চেষ্টা করছে। 

অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা সম্মেলনের রাজনৈতিক বার্তা নিয়ে পাল্টা প্রচারণা চালাচ্ছে। তাদের বক্তব্য, নভেম্বরের নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে না; বরং ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও আগামী দুই বছরের রাজনৈতিক গতিপথের ওপরও এর বড় প্রভাব পড়বে।

ডালাসের এই সম্মেলন রিপাবলিকান পার্টির জন্য শুধু একটি দলীয় সমাবেশ নয়। এটি ট্রাম্পের নেতৃত্বে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি, ভোটারদের উজ্জীবিত করা এবং কংগ্রেসে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। আগামী কয়েক সপ্তাহে এই সম্মেলনের বার্তা কতটা ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিই এখন মার্কিন রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর