রিপাবলিকানরা কংগ্রেস ধরে রাখলে প্রাপ্তবয়স্কদের ৫ হাজার ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ট্রাম্পের
কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের জয় হলে প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানদের প্রত্যেককে পাঁচ হাজার ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ট্রাম্পের, নির্বাচনের আগে ঘোষণায় তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু।
রিপাবলিকানরা কংগ্রেস ধরে রাখলে প্রাপ্তবয়স্কদের ৫ হাজার ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ট্রাম্পের
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে দেশটির প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের প্রত্যেককে ৫ হাজার ডলার করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ট্রাম্পের ভাষায়, এটি হবে একটি ‘ট্রাম্প ডিভিডেন্ড’। তবে প্রস্তাবটি এখনো সরকারি কর্মসূচি হিসেবে অনুমোদিত হয়নি এবং এর অর্থায়ন, যোগ্যতা ও বাস্তবায়ন নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
বুধবার টেক্সাসের ডালাসে রিপাবলিকান পার্টির মধ্যবর্তী নির্বাচনকেন্দ্রিক সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প এই প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, নভেম্বরে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানরা ৫ হাজার ডলারের অর্থপ্রাপ্তির সুযোগ পাবেন। তিনি অর্থটি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই ব্যয় করার কথা বলেন।
ট্রাম্পের এই ঘোষণাকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। ট্রাম্প নিজে এই নির্বাচনে প্রার্থী নন, কিন্তু রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে তিনি সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২৭ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ থাকায় প্রত্যেককে ৫ হাজার ডলার করে দেওয়া হলে মোট ব্যয় প্রায় ১ দশমিক ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এত বড় অর্থের সংস্থান কীভাবে করা হবে, সেটিই এখন প্রস্তাবটির সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি।
ট্রাম্প প্রস্তাবটির সম্ভাব্য অর্থায়নের সঙ্গে শুল্ক থেকে পাওয়া রাজস্বের কথা যুক্ত করেছেন। তবে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, বর্তমান শুল্ক রাজস্ব এত বড় একটি কর্মসূচির সম্ভাব্য ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সও পরে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ধনী আমেরিকানদের এই অর্থপ্রদানের বাইরে রাখা হতে পারে। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত কারা এই অর্থ পাবেন, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য ৫ হাজার ডলারের কোনো অর্থপ্রদান এখন অনুমোদিত বা নিশ্চিত হয়নি। এমন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে। ফলে ট্রাম্পের ঘোষণাকে আপাতত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা প্রস্তাব হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
প্রস্তাবটির অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ ইতোমধ্যে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং দেশটির বার্ষিক বাজেট ঘাটতিও বিপুল। এই পরিস্থিতিতে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয়ের একটি নতুন কর্মসূচি সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে বলে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।
মূল্যস্ফীতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, বিপুল পরিমাণ অর্থ সরাসরি মানুষের হাতে পৌঁছালে পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়তে পারে এবং এর ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্পের সমর্থকেরা এটিকে সাধারণ মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার একটি বড় অর্থনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
ট্রাম্পের ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম ও অর্থনীতি ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ। একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার জন্য এই ধরনের সরাসরি অর্থপ্রদানের প্রতিশ্রুতি রিপাবলিকান প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ডালাসের সম্মেলনে ট্রাম্প প্রায় এক ঘণ্টা ৪৫ মিনিট বক্তব্য দেন এবং রিপাবলিকানদের পক্ষে নভেম্বরের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি ভোটারদের এমনভাবে নির্বাচনের দিকে তাকাতে বলেন, যেন তিনিই ব্যালটে রয়েছেন।
তবে রিপাবলিকান দলের সব প্রার্থী যে এই কৌশল নিয়ে স্বস্তিতে আছেন, এমন নয়। নির্বাচনীভাবে কঠিন লড়াইয়ের মুখে থাকা কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থী সম্মেলনে উপস্থিত হননি। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ও তাঁর নীতিগুলো নিয়ে বিতর্কের কারণে কিছু প্রার্থী নিজেদের প্রচারণায় দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।
ট্রাম্পের ৫ হাজার ডলারের ঘোষণা ইতোমধ্যে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি করেছে। ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে এটিকে ভোটারদের আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টা হিসেবে সমালোচনা করা হয়েছে। তবে আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তাবটি সরাসরি ভোটের বিনিময়ে অর্থ দেওয়ার ঘোষণা হিসেবে গণ্য হবে কি না, সেটিও আলাদা আইনি প্রশ্ন। এপি জানিয়েছে, প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের জন্য আইনগত ও আর্থিক কাঠামো প্রয়োজন হবে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের ৫ হাজার ডলারের ‘ডিভিডেন্ড’ এখনো বাস্তব অর্থপ্রদানের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এটি বাস্তবায়িত হবে কি না, হলে কারা পাবেন, অর্থের উৎস কী হবে এবং কংগ্রেস এতে অনুমোদন দেবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের এই ঘোষণা তাই একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি, নির্বাচনী কৌশল এবং বড় আর্থিক নীতির প্রস্তাব হিসেবে আলোচনায় এসেছে। আগামী সপ্তাহগুলোতে রিপাবলিকান নেতৃত্ব ও কংগ্রেসের সদস্যরা এ বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করেন কি না, সেটিই এখন নজরদারির বিষয়।