অনিয়ম–জালিয়াতির অভিযোগের মধ্যেই ডব্লিউএইচও’র পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ
অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগের তদন্তের মধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন সায়মা ওয়াজেদ।
অনিয়ম–জালিয়াতির অভিযোগের মধ্যেই ডব্লিউএইচও’র পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন সায়মা ওয়াজেদ। অনিয়ম, আর্থিক জালিয়াতি, শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে তথ্য গোপন বা ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ এবং বাংলাদেশে জমি সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্তের মধ্যেই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বুধবার তাঁর পদত্যাগপত্রের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়েসুসের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালনে বাধা এবং বেতন ছাড়া ছুটিতে থাকার কারণে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রায় এক বছর ধরে পারিশ্রমিক না পাওয়ায় তাঁর আর্থিক পরিস্থিতিও অসহনীয় হয়ে উঠেছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
সায়মা ওয়াজেদ বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। ওই পদে তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদ নির্ধারিত ছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালকরা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সদস্য দেশগুলোর ভোটে নির্বাচিত হন এবং তাঁরা বিভিন্ন দেশের জনস্বাস্থ্য নীতি, রোগের প্রাদুর্ভাব, জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কার্যক্রম সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তাঁর নিয়োগ ও যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশন তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে এবং পরে মামলা করে। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক পদে প্রার্থী হওয়ার সময় শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ। এছাড়া প্রভাব ব্যবহার করে একটি বেসরকারি উদ্যোগের জন্য বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহ এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের মামলায় উঠে আসে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকেও তাঁর বিরুদ্ধে আলাদা কিছু অভিযোগের কথা সামনে এসেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে চীন সফর সংক্রান্ত ব্যয়ের ক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে। তাঁর আইনজীবীরা অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভ্রমণ ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রায় ৯০১ মার্কিন ডলারের বিষয়টি ছিল প্রশাসনিক ভুল এবং একজন সহকারীর মাধ্যমে নিয়মিত ব্যয়ের হিসাব প্রক্রিয়াকরণের সময় ভুল হয়েছিল।
শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অভিযোগের ক্ষেত্রেও সায়মা ওয়াজেদ নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তাঁর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিনি একটি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং অটিজম নিয়ে তাঁর কাজের সঙ্গে ওই স্বীকৃতির সম্পর্ক রয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালকের কাছে প্রকাশ করা হয়েছিল।
তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে জমি সংক্রান্ত অভিযোগও রয়েছে। পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ এ অভিযোগের কথা উল্লেখ করে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট জমি তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যোগ দেওয়ার আগেই অর্জন করেছিলেন এবং বাংলাদেশের একটি আইনের আওতায় সেটি পাওয়ার অধিকার তাঁর ছিল।
অভিযোগের কারণে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাঁকে ছুটিতে পাঠায়। পরে তিনি বেতনবিহীন প্রশাসনিক ছুটিতে ছিলেন। দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে না পারলেও তাঁর আনুষ্ঠানিক পদটি বহাল ছিল। সর্বশেষ পদত্যাগের মাধ্যমে সেই দায়িত্ব থেকে তিনি নিজেই সরে দাঁড়ালেন।
পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বের প্রতি হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জনগণের জন্য কাজ করতে চেয়েছিলেন এবং নিজের দায়িত্ব আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করেছেন। কিন্তু তাঁকে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হচ্ছে না বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও জানিয়েছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বের ওপর তাঁর আস্থা ও বিশ্বাস আর আগের অবস্থায় নেই। দীর্ঘ সময় বেতন ছাড়া থাকার বিষয়টিও তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনো তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। প্রতিষ্ঠানটি আগে জানিয়েছিল, বিষয়টি গোপনীয়তার আওতায় থাকায় তারা বিস্তারিত মন্তব্য করবে না। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর কোনটি শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়েছে বা হয়নি—এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সতর্ক থাকা জরুরি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সায়মা ওয়াজেদ পদত্যাগ করেছেন মানেই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ আদালত বা তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি বলা যাবে না। তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে অভিযোগ ও তদন্তের তথ্য রয়েছে, কিন্তু এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর নিজেরও প্রত্যাখ্যান ও ব্যাখ্যা রয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের জন্য নতুন আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মনোনয়ন, প্রার্থী যাচাই এবং পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন পরিচালক বেছে নেওয়া হবে।
সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত কীভাবে পৌঁছেছে, সেটিও সামনে নিয়ে এসেছে। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তাঁর পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ও তদন্ত শুরু হয়। সায়মা ওয়াজেদের ক্ষেত্রেও সেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া নতুন মাত্রা পায়।
তবে তাঁর পদত্যাগকে শুধু রাজনৈতিক ঘটনার ফল হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কারণ তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিজস্ব প্রশাসনিক ও আর্থিক তদন্তের বিষয়ও রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশনের করা মামলাগুলোও আলাদা আইনি প্রক্রিয়ার অংশ।
অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগের মধ্যে দীর্ঘ সময় দায়িত্বের বাইরে থাকার পর সায়মা ওয়াজেদ এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া। তাই পদত্যাগের ঘটনাকে নিশ্চিত অপরাধের প্রমাণ হিসেবে না দেখে, অভিযোগ, তদন্ত এবং তাঁর নিজের বক্তব্য—তিনটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করাই তথ্যগতভাবে সঠিক।