ইসরায়েলি হামলায় গাজার আল-শাতি শরণার্থী শিবিরে আবাসিক ভবনে আগুন, আহত অন্তত ৭
গাজা শহরের আল-শাতি শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি হামলায় একটি আবাসিক ভবনে আগুন ও ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে, বাসিন্দাদের মধ্যে তৈরি হয় আতঙ্ক।
ইসরায়েলি হামলায় গাজার আল-শাতি শরণার্থী শিবিরে আবাসিক ভবনে আগুন, আহত অন্তত ৭
গাজা শহরের আল-শাতি শরণার্থী শিবিরে একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ব্যাপক আগুন ও ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে। ৯ সেপ্টেম্বরের এই হামলার মুহূর্তের ভিডিওতে একটি ভবনে বিস্ফোরণের পর আগুন ও ঘন কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। রয়টার্সের ছবির বর্ণনা অনুযায়ী, হামলাটি চালানো হয় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে ওই এলাকার বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার সতর্কবার্তা দেওয়ার পর।
প্রাথমিকভাবে ঘটনাস্থল থেকে তাৎক্ষণিক হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ফক্স নিউজও হামলার ভিডিও প্রকাশ করে জানায়, স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য অনুযায়ী, হামলাটি সরিয়ে নেওয়ার সতর্কবার্তার পর ঘটে এবং তখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
তবে পরবর্তী প্রতিবেদনে পরিস্থিতির ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম তুর্কি সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, আল-শাতি শরণার্থী শিবিরের একটি বহুতল আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত সাতজন আহত হন। হামলাটি গাজার পশ্চিমাঞ্চলীয় এই ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবিরের একটি আবাসিক এলাকায় চালানো হয়।
এদিকে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, বুধবার গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত নয়জন আহত হয়েছেন। মধ্য গাজার নুসেইরাত এলাকায় একটি বাড়িতে হামলার পর আহতদের আওদা হাসপাতালে নেওয়া হয়। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী নুসেইরাত, দারাজ-তুফাহ এবং আল-শাতি শরণার্থী শিবিরে হামলা চালানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এপি প্রকাশিত ভিডিওতেও আল-শাতি শিবিরে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার মুহূর্ত এবং পরবর্তী বড় বিস্ফোরণ দেখা যায়।
হামলার আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশকে এলাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। রয়টার্সের ছবির তথ্যেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সরিয়ে নেওয়ার সতর্কবার্তার পর ওই বাড়িতে হামলা চালানো হয়। হামলার সময় ভবনটির ওপর ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার দৃশ্যও রয়টার্সের আলোকচিত্রে ধরা পড়েছে।
আল-শাতি বা বিচ শরণার্থী শিবির গাজা শহরের পশ্চিম অংশে ভূমধ্যসাগরের কাছাকাছি অবস্থিত। দীর্ঘদিন ধরে এটি গাজার অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। যুদ্ধের আগেও এখানে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি শরণার্থী বসবাস করতেন। চলমান সংঘাতে শিবিরটির বহু ভবন ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে নতুন করে কোনো আবাসিক ভবনে হামলা হলে আশপাশের মানুষের জন্য ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, হামলার আগে দেওয়া সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ বাস্তবে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটা কার্যকর হচ্ছে—এ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। গাজার বহু বাসিন্দা ইতোমধ্যে একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ফলে কোনো এলাকা ছাড়ার নির্দেশ পেলেও তাদের জন্য নিরাপদ ও স্থায়ী আশ্রয় খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতেও গাজা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর গাজা শহরে একটি ইসরায়েলি হামলায় ইউসুফ আকিলা ও তাঁর আট বছর বয়সী মেয়ে ওয়াফা নিহত হন এবং আরও ছয়জন আহত হন বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছিল, হামলার লক্ষ্য ছিল একজন হামাস যোদ্ধা।
এ ধরনের হামলা এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন গাজায় যুদ্ধবিরতির পরও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান ও হামলা অব্যাহত রয়েছে। ফিলিস্তিনি পক্ষ এসব হামলাকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে ইসরায়েল বলছে তারা হামাসের সামরিক হুমকি মোকাবিলায় অভিযান চালাচ্ছে।
আল-শাতি শরণার্থী শিবিরের সর্বশেষ হামলার ক্ষেত্রেও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। তাই ভবনটিতে হামলার উদ্দেশ্য বা সেখানে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য উপস্থিত ছিল কি না—এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
তবে বিভিন্ন উৎসের তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, হামলাটি বাস্তব এবং এর ভিডিও ও ছবি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। রয়টার্সের আলোকচিত্রে হামলার সময় একটি বাড়ির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য এবং হামলার পর ধোঁয়া ও আগুনের ছবি রয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও হামলার ভিডিও প্রকাশ করেছে।
হামলার পর গাজার বেসামরিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষদের জন্য হামলার সময় দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, আহত ও বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি।
সাম্প্রতিক হামলাগুলো গাজার মানবিক সংকটকেও আরও জটিল করে তুলছে। বহু মানুষ ইতোমধ্যে বাড়িঘর হারিয়ে অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছেন। কোথাও নতুন করে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ এলে তাদের সামনে নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার পাশাপাশি খাবার, পানি, চিকিৎসা এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার প্রশ্নও দেখা দেয়।
এদিকে গাজা নিয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতিও উত্তপ্ত রয়েছে। ইসরায়েলের কয়েকজন ডানপন্থী মন্ত্রী গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের ব্যাপকভাবে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার পর এ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বেড়েছে। তবে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার ৯ সেপ্টেম্বর বলেছেন, সরকার গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের বহিষ্কারের কোনো পরিকল্পনা করছে না। যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলবিষয়ক রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও এর আগে বলেছিলেন, ফিলিস্তিনিদের জোর করে গাজা থেকে বের করে দেওয়ার কোনো মার্কিন-সমর্থিত পরিকল্পনা নেই।
সব মিলিয়ে, আল-শাতি শরণার্থী শিবিরে ৯ সেপ্টেম্বরের হামলা গাজার চলমান অস্থিরতার আরেকটি গুরুতর ঘটনা। হামলার আগে সরিয়ে নেওয়ার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল—এ তথ্য রয়টার্সের ছবির নথিতে নিশ্চিত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে হতাহতের খবর না থাকলেও পরবর্তী প্রতিবেদনে আল-শাতি হামলায় আহতের খবর পাওয়া গেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস গাজার বিভিন্ন হামলায় অন্তত নয়জন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে।