ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যাপক আতঙ্ক
ইরানের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে আতঙ্ক, পাল্টা হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে যুদ্ধের উত্তেজনা ও উদ্বেগ।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যাপক আতঙ্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। সর্বশেষ পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলার অংশ হিসেবে ইরান জর্ডানে মার্কিন সেনাদের ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি প্রতিহত করা হয়েছে। বাকি দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে। এখন পর্যন্ত এই হামলায় হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি ঘটে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করার পর। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এর আগে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী মার্কিন নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে পরপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। সেই হামলার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেলবাহী জাহাজে হামলা চালায়। এরপরই ইরান জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল জর্ডানের আল-আজরাক এলাকার মুয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটি। এটি জর্ডানের পূর্বাঞ্চলীয় মরুভূমি এলাকায় অবস্থিত এবং আম্মান থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। ঘাঁটিটি জর্ডানের বিমানবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হলেও সেখানে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক কর্মকাণ্ডে ঘাঁটিটির কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে, তারা ঘাঁটির বিমান রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রস্তুতিমূলক স্থাপনা এবং মার্কিন যুদ্ধবিমান রাখার জায়গাগুলো লক্ষ্য করেছে। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এ হামলার ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে এবং সেখানে ঘাঁটিতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার দাবি করা হয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে জর্ডানের সামরিক বাহিনীর বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের দাবি অনুযায়ী, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ছোড়া ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি ধ্বংস বা প্রতিহত করেছে। অন্য দুটি ক্ষেপণাস্ত্র এমন এলাকায় পড়েছে যেখানে জনবসতি নেই। ফলে হামলায় প্রাণহানি বা বড় ধরনের বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, জর্ডানে ইরানের হামলা কার্যকর হয়নি এবং সেখানে থাকা সব মার্কিন সেনা নিরাপদে অবস্থান করছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন কিছু দাবি—যেখানে বলা হচ্ছে মার্কিন সেনারা হামলা থেকে বাঁচতে পাহাড়ে পালিয়ে যায়—তা এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত নয়।
এখানেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারিত বক্তব্য এবং যাচাই করা তথ্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ইরান যে জর্ডানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, সেটি একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। কিন্তু মার্কিন সেনারা ব্যাপকভাবে ঘাঁটি ছেড়ে পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছিল বা পালিয়ে গিয়েছিল—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য রয়টার্স, এপি বা জর্ডানের সামরিক বিবৃতিতে পাওয়া যায়নি।
তবে হামলার গুরুত্ব কোনোভাবেই কম নয়। জর্ডান যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্র এবং দেশটিতে একাধিক মার্কিন সামরিক স্থাপনা রয়েছে। এ কারণে জর্ডানের ঘাঁটিগুলো ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এর আগেও এই ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে হামলা হয়েছে এবং জুলাই মাসে ইরানি হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছিল।
সর্বশেষ হামলার আগে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সমুদ্রপথে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করার কথা জানায়। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানি জাহাজ ও সামরিক তৎপরতা মার্কিন বাহিনীর জন্য হুমকি তৈরি করছিল। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালির আশপাশে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয়।
এরপর ইরান দাবি করে, তারা হরমুজ প্রণালির কাছে ১০টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। ইরানি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, এসব জাহাজের মধ্যে দুটি মার্কিন জাহাজ এবং কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র মার্কিন জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি অস্বীকার করেছে। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরানের হামলার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
এই সামুদ্রিক সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। যুদ্ধের কারণে এই পথ দিয়ে জ্বালানি পরিবহন কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বুধবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর ইঙ্গিত দেয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ সংঘাতের নতুন ধাক্কায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যুদ্ধের আগে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। ফলে সামরিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া, ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ইরান শুধু সরাসরি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলার হুমকি দিচ্ছে না; সমুদ্রপথ ও আঞ্চলিক মার্কিন মিত্রদের ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে। একই সময়ে ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনী সৌদি আরবের কয়েকটি শহর ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এসব ঘটনার কারণে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন পাল্টা হামলার ধারাবাহিকতা। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতায় আঘাত করছে, আর ইরান তার প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, যুদ্ধজাহাজ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের লক্ষ্য করছে। ফলে একটি হামলার পর আরেকটি হামলা হচ্ছে এবং প্রতিটি নতুন আক্রমণ সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও দ্রুত বাড়ছে। কারণ এই জলপথে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি মূল্য, পরিবহন ব্যয় এবং খাদ্যপণ্যের দামেও চাপ তৈরি হতে পারে।
জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলমান যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায়। ইরান হামলার মাধ্যমে শক্তিশালী প্রতিশোধের বার্তা দিতে চাইলেও জর্ডানের দাবি অনুযায়ী অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত হয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে থাকা মার্কিন সেনারা নিরাপদে রয়েছে।
তবে হামলার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো—সংঘাত এখন শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক স্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জর্ডান, সৌদি আরব, উপসাগরীয় জলপথ এবং হরমুজ প্রণালিও ক্রমশ সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।