ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে হরমুজে জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলা, তেলের দাম ছাড়াল ১০০ ডলার
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত তীব্র, হরমুজে জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলা, তেলের সরবরাহ কমে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ছাড়াল ১০০ ডলার, বাড়ছে উদ্বেগ বিশ্বজুড়ে।
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে হরমুজে জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলা, তেলের দাম ছাড়াল ১০০ ডলার
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ছয় মাস ধরে চলা সংঘাত নতুন করে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বুধবার হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজকে ঘিরে বড় ধরনের পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। রয়টার্সের আজকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ১০টি জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংসের পর প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি জানিয়েছে, তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল দুটি মার্কিন জাহাজ এবং আটটি তেলবাহী জাহাজ। তবে মার্কিন কর্তৃপক্ষ তাদের যুদ্ধজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে ইরানের দাবি করা ১০টি জাহাজের সবগুলোতে হামলা হয়েছে কি না, তা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা করার পর তারা পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরান মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে গেলে আরও ইরানি ট্যাংকার হামলার শিকার হতে পারে।
হামলার প্রভাব ইতোমধ্যে বাণিজ্যিক নৌ চলাচলে পড়েছে। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, উত্তর উপসাগর ও ওমান উপসাগরের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দুবাইয়ের কাছে হারকিউলিস স্টার নামের একটি তেলবাহী জাহাজে একজন নাবিক নিহত এবং আরেকজন নিখোঁজ হয়েছেন বলে জাহাজটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে।
ইরাকের জলসীমায় নিউ অ্যান্ড্রোস নামের আরেকটি ট্যাংকার ড্রোন হামলার পর আগুন ধরে যায়। জাহাজটিতে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল ছিল বলে রয়টার্স জানিয়েছে। ২২ জন ক্রুর কেউ হতাহত হননি।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ছে তেলের বাজারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হয়। সংঘাতের আগে এই পথে প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল চলাচল করলেও সাম্প্রতিক সংঘাতের পর প্রবাহ প্রায় ২ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন পর্যন্ত নেমে গেছে বলে রিস্ট্যাড এনার্জির তথ্যের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। বুধবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা জুলাইয়ের পর প্রথমবার এই সীমা অতিক্রম করেছে। জ্বালানি সরবরাহ দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে বিশ্বজুড়ে পরিবহন, উৎপাদন ও পণ্যের দামেও চাপ বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, বুধবার মার্কিন ডিজেলের গড় খুচরা মূল্য প্রতি গ্যালন ৫.৯৪ ডলারের ওপরে উঠে নতুন রেকর্ড করেছে। গ্যাসোলিনের দামও বছরের এই সময়ের তুলনায় রেকর্ড উচ্চতায় রয়েছে।
সমুদ্রপথের পাশাপাশি ইরান জর্ডানে মার্কিন বাহিনী ব্যবহার করে এমন একটি ঘাঁটি লক্ষ্য করেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে বলে আইআরজিসি জানিয়েছে। জর্ডানের সামরিক বাহিনী বলেছে, ২০টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিহত করেছে এবং দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, সেখানে থাকা সব মার্কিন সেনা নিরাপদে রয়েছেন।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনী সৌদি আরবের কয়েকটি শহর ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব হামলায় ৭৩ জন আহত হয়েছেন। ফলে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিত সাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড আরও বড় প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের দুই বা তিনটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়, তাহলে ইরান ২০টি লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত করতে পারে। একই সঙ্গে হরমুজ ও এর আশপাশে আরও বিস্তৃত সমুদ্র এলাকা ‘নিষিদ্ধ’ বা নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল, পরিবহন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে এশিয়ার তেলনির্ভর অর্থনীতিগুলো এই সংকটে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।