কলেজে না গিয়েই মাসে ৪ লাখ আয়, ২০ বছরেই মাকে দিলেন অবসর

কলেজের ডিগ্রি নেই, বয়স মাত্র ২০! তবু ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন কাজ করে মাসে প্রায় ৪ লাখ আয়—সবচেয়ে বড় অর্জন, নিজের উপার্জনে মাকে দিলেন অবসর।

কলেজে না গিয়েই মাসে ৪ লাখ আয়, ২০ বছরেই মাকে দিলেন অবসর

কলেজে না গিয়েই মাসে ৪ লাখ আয়, ২০ বছরেই মাকে দিলেন অবসর


বয়স মাত্র ২০ বছর। অথচ এই বয়সেই নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি মাকেও কাজ থেকে অবসর দিয়েছেন বিহারের এক তরুণ। কলেজের ডিগ্রি ছাড়াই অনলাইনভিত্তিক কাজ, গ্রাফিক ডিজাইন, ফ্রিল্যান্সিং ও ওয়েব থ্রি মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে বর্তমানে তিনি মাসে প্রায় ৪ হাজার মার্কিন ডলার আয় করছেন বলে দাবি করেছেন। ভারতীয় মুদ্রায় এই আয় প্রায় ৪ লাখ রুপির কাছাকাছি। তাঁর ব্যতিক্রমী সাফল্যের গল্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তরুণদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

ওই তরুণ নিজের জীবনের গল্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্টে তুলে ধরেছেন। সেখানে তিনি জানিয়েছেন, মাত্র ১৪ বছর বয়স থেকেই অনলাইনে ডিজাইন ও সম্পাদনার কাজ শেখা শুরু করেন। ২০২০ সালের দিকে তিনি বিভিন্ন পেশাদার অনলাইন গেমিং দলের জন্য গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ করতেন। ছোট বয়সে শুরু করা সেই কাজই ধীরে ধীরে তাঁর ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারের ভিত্তি তৈরি করে।

তবে তাঁর পথ মোটেও সহজ ছিল না। ভারতে অনলাইন গেমটি নিষিদ্ধ হওয়ার পর তাঁর কাজ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। হঠাৎ করে আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁকে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ভাবতে থাকেন, আবার অনলাইনে কাজ শুরু করবেন নাকি প্রচলিত পথে কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাবেন।

২০২৪ সালে দ্বাদশ শ্রেণির পড়াশোনা শেষ করার পর তাঁর সামনে নতুন একটি সুযোগ আসে। পুরোনো এক পরিচিতের মাধ্যমে একটি ওয়েব থ্রি বিপণন প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পান তিনি। কলেজে ভর্তি না হয়ে তিনি বিহার থেকে নয়ডায় চলে যান। সেখানে তাঁর মাসিক বেতন ছিল মাত্র ১৫ হাজার রুপি। তবে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

নয়ডার সেই চাকরির অভিজ্ঞতা অবশ্য তাঁর জন্য খুব একটা সুখকর ছিল না। তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, চাকরির শুরুতে তাঁকে প্রায় খালি একটি ঘরে একটি গদি ও ট্রলি নিয়ে থাকতে হয়েছিল। কয়েক মাস পর থাকার পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হলেও কাজ নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস চাকরি করার পর তিনি নয়ডা ছেড়ে আবার বিহারে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

বিহারে ফিরে এসে তিনি শূন্য থেকে আবার নিজের কাজ শুরু করেন। একটি প্রযুক্তিভিত্তিক অনলাইন সম্প্রদায়ের জন্য বিনামূল্যে ব্র্যান্ড ও লোগো ডিজাইন করতে শুরু করেন। প্রথমদিকে তাঁর আয় ছিল খুবই কম। মাসে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ মার্কিন ডলার আয় করতেন তিনি। তবে বিনামূল্যে কাজ করার মাধ্যমে তিনি নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হন এবং ধীরে ধীরে নিজের কাজের পরিচিতি বাড়াতে থাকেন।

পরবর্তীতে ওয়েব থ্রি জগতের এক পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রাফিক্স তৈরির কাজ পান তিনি। সেই কাজ থেকেই ধীরে ধীরে আরও নতুন গ্রাহক বা ক্লায়েন্ট আসতে শুরু করে। শুধু গ্রাফিক ডিজাইনেই সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি ওয়েব থ্রি বিপণনের কাজও শেখেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দক্ষতা এবং কাজের পরিধি দুটিই বাড়তে থাকে।

নিজের পোস্টে ওই তরুণ দাবি করেছেন, শুরুতে যেখানে তিনি মাসে মাত্র ২০০ ডলার আয় করতেন, সেখানে ধীরে ধীরে তাঁর মাসিক আয় ২ হাজার ডলারে পৌঁছে যায়। পরে সেই আয় আরও বাড়তে থাকে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিনি মোট প্রায় ১২ লাখ রুপি আয় করেছেন। বর্তমানে নিয়মিতভাবে প্রতি মাসে প্রায় ৪ হাজার ডলার আয় করছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

শুধু নিয়মিত আয়ের কথাই নয়, নিজের জীবনের সবচেয়ে বেশি আয়ের একটি মাসের কথাও জানিয়েছেন ওই তরুণ। তাঁর দাবি অনুযায়ী, সাম্প্রতিক এক মাসে তাঁর আয় প্রায় ৬ হাজার ৫০০ ডলারে পৌঁছেছিল। ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৫ লাখ রুপির কাছাকাছি। তবে তাঁর আয়সংক্রান্ত এসব তথ্য মূলত তাঁর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত হয়েছে। স্বাধীনভাবে তাঁর আয়কর নথি বা ব্যাংক হিসাব যাচাই করা হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

তাঁর সাফল্যের গল্পের সবচেয়ে আবেগঘন বিষয় হলো তাঁর মা। তরুণটির দাবি, আয় বাড়ার পর তিনি নিজের জন্য জরুরি সঞ্চয় তৈরি করেছেন এবং দীর্ঘদিনের স্বপ্নের একটি ম্যাকবুক প্রো কিনেছেন। তবে নিজের জন্য কেনাকাটার চেয়েও তাঁর কাছে বড় অর্জন হলো মাকে কাজ থেকে অবসর দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। তিনি জানিয়েছেন, কয়েক মাস পরপর মায়ের জন্য সোনা কেনেন এবং ভবিষ্যতে জমি বা ফ্ল্যাট কেনার জন্যও টাকা জমাচ্ছেন।

তবে অর্থনৈতিকভাবে সফল হলেও তাঁর জীবন যে পুরোপুরি সমস্যামুক্ত হয়ে গেছে, এমন নয়। নিজের পোস্টেই তিনি জানিয়েছেন, এখনও তাঁর মধ্যে একাকিত্ব রয়েছে এবং ব্যক্তিগত জীবনেও নানা সমস্যা রয়েছে। অর্থ উপার্জন বাড়লেও জীবনের সব ধরনের শূন্যতা যে অর্থ দিয়ে পূরণ করা যায় না, তাঁর বক্তব্যে সেই বিষয়টিও উঠে এসেছে।

ওই তরুণ জানিয়েছেন, তাঁর এই গল্প কাউকে নিজের সাফল্য দেখিয়ে গর্ব করার জন্য নয়। বরং নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার উদ্দেশ্য হলো অন্য তরুণদের উৎসাহ দেওয়া। তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, খুব অল্প বয়সে কোনো একটি দক্ষতা শেখা, নিয়মিত অনুশীলন করা, সুযোগ তৈরি করা এবং ব্যর্থতার পর আবার শুরু করার মাধ্যমে অনলাইন দুনিয়ায় ক্যারিয়ার গড়ে তোলা সম্ভব।

তবে তাঁর গল্প থেকে এমন ধারণা নেওয়া ঠিক হবে না যে কলেজের পড়াশোনা বা ডিগ্রির কোনো প্রয়োজন নেই। বরং তাঁর ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে দক্ষতা অর্জন, বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, পরিচিতি তৈরি এবং একাধিকবার ব্যর্থ হওয়ার পরও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই বড় ভূমিকা রেখেছে। তাই তাঁর গল্পকে ডিগ্রির বিকল্প হিসেবে নয়, বরং নিজের দক্ষতা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে অনলাইনে ডিজাইন শেখা থেকে শুরু করে ২০ বছর বয়সে মাসে প্রায় ৪ হাজার ডলার আয়ের দাবি—বিহারের এই তরুণের যাত্রা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। তবে তাঁর আয়ের তথ্য যেহেতু মূলত তাঁর নিজের বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীল, তাই বিষয়টিকে নিশ্চিত প্রমাণিত আয় হিসেবে নয়, তাঁর নিজের দাবি হিসেবে বিবেচনা করাই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর