শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগে ক্ষোভ, শেখ হেলালের বাসায় নেতাদের বৈঠক
শেখ হাসিনার নতুন সিদ্ধান্ত ঘিরে আওয়ামী লীগে অসন্তোষ, কলকাতায় শেখ হেলালের বাসায় জ্যেষ্ঠ নেতাদের বৈঠক নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগে ক্ষোভ, শেখ হেলালের বাসায় নেতাদের বৈঠক
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের সভাপতির দায়িত্ব শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে দেওয়ার কথা জানানোর পর দলটির একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কলকাতায় আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা বৈঠক করে নিজেদের আপত্তির কথা জানিয়েছেন বলে জানিয়েছে।
ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি অনুপস্থিত থাকলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। শেখ হাসিনার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শেখ সেলিমই সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠতম সদস্য।
এই বক্তব্য প্রকাশের পর আওয়ামী লীগের একটি অংশের নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় সোমবার রাতে ভারতের কলকাতার নিউ টাউনে শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই ও সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিনের বাসায় একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন বলে সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে।
বিডিনিউজ২৪-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন নাসিম ও মাহমুদুল হাসান রিপনসহ প্রায় ৮ থেকে ১০ জন নেতা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে উপস্থিত একজন নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত নিয়ে একজন কেন্দ্রীয় নেতা সরাসরি শেখ হেলালের সামনে নিজের অস্বস্তির কথা তুলে ধরেন। পরে অন্য নেতারাও শেখ সেলিমের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভূমিকা এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর আচরণ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৈঠকে শেখ সেলিমকে দলের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার পরিবর্তে অন্য কোনো জ্যেষ্ঠ নেতাকে বিবেচনা করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে জাহাঙ্গীর কবির নানকের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার বিষয়টি শেখ হাসিনার কাছে তুলে ধরার জন্য শেখ হেলালের সহযোগিতা চাওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
একজন নেতা বিডিনিউজ২৪কে বলেন, শেখ হেলালের বাসায় ওই জমায়েতের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল জাহাঙ্গীর কবির নানককে দলের জন্য ‘বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে তুলে ধরা। ওই নেতার দাবি, নানক দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় ছিলেন। তাই নেতৃত্বের বিষয়টি বিবেচনার সময় তাঁর ভূমিকা গুরুত্ব পাওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হেলাল উপস্থিত নেতাদের বক্তব্য শেখ হাসিনার কাছে তুলে ধরবেন এবং বিষয়টির সমাধানের চেষ্টা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। তবে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবর্তন হয়েছে—এমন কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
শেখ ফজলুল করিম সেলিম আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই এবং দীর্ঘদিন ধরে দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য। অন্যদিকে শেখ হেলাল উদ্দিন শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই। ফলে নেতৃত্বের প্রশ্নে শেখ পরিবারের সদস্যদের ঘিরে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সমীকরণও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ সেলিমকে নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে এক ধরনের মতপার্থক্য থাকলেও দলের আরেকটি অংশ তাঁর প্রতি আস্থাশীল। তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন নেতা শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে নেতৃত্বের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের ভেতরে একাধিক মত তৈরি হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন অবশ্য শেখ সেলিমকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি দলীয় গঠনতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সভাপতি অনুপস্থিত থাকলে সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ সদস্য সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন এবং বর্তমান কমিটিতে শেখ সেলিমই সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সদস্য।
আওয়ামী লীগের ২০২২ সালের ২২তম জাতীয় সম্মেলনে শেখ হাসিনা আবারও দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর দলের সভাপতিমণ্ডলীর কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সদস্যের মৃত্যুর ফলে বর্তমান তালিকায় শেখ সেলিম সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে অবস্থান করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কে সামলাবেন এ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে দলটির ভেতরে নতুন করে আলোচনা ও মতপার্থক্য সামনে এসেছে। কলকাতায় শেখ হেলালের বাসায় অনুষ্ঠিত বৈঠক সেই অসন্তোষের একটি প্রকাশ বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে এটিকে পুরো আওয়ামী লীগের সর্বসম্মত অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি মূলত দলের একটি অংশের নেতাদের বক্তব্য ও অসন্তোষের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত সংবাদ।