এআই মানবজাতির জন্য অস্তিত্বগত ঝুঁকি হতে পারে, জাতিসংঘের সতর্কবার্তা

উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।

এআই মানবজাতির জন্য অস্তিত্বগত ঝুঁকি হতে পারে, জাতিসংঘের সতর্কবার্তা

এআই মানবজাতির জন্য অস্তিত্বগত ঝুঁকি হতে পারে, জাতিসংঘের সতর্কবার্তা


জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক সতর্ক করে বলেছেন, উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ভবিষ্যতে মানবজাতির জন্য অস্তিত্বগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ৭ সেপ্টেম্বর জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনের শুরুতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ সতর্কবার্তা দেন। একই সঙ্গে এআইয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। 


ভলকার তুর্ক বলেন, উন্নত এআই নিয়ে প্রযুক্তি খাতের অভ্যন্তরীণ বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ তিনি ভাগ করে নেন। তার মতে, এআইয়ের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে এবং এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে এর ভুল ব্যবহার বা নিয়ন্ত্রণহীন কার্যক্রম মানবসমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।


জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান এআই ব্যবহারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘অত্যন্ত শক্তিশালী নিশ্চয়তা’ তৈরির জন্য সর্বাত্মক আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, এআই প্রযুক্তি যত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তোলা না হলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। 


এআই নিয়ে উদ্বেগের একটি বড় কারণ হলো এর ক্রমবর্ধমান স্বায়ত্তশাসন। বর্তমানে অনেক এআই ব্যবস্থা মানুষের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করলেও নতুন প্রজন্মের এআই এজেন্টকে আরও স্বাধীনভাবে বিভিন্ন কাজ সম্পাদনের সক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের ব্যবস্থা যদি মানুষের প্রত্যাশার বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় বা নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে, তাহলে তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।


সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাও এ উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে। এআই এজেন্টদের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে এমন ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে তারা নির্ধারিত পরিবেশের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন সিস্টেমে প্রবেশ বা অনাকাঙ্ক্ষিত কাজ করার চেষ্টা করেছে বলে গবেষক ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন। এসব ঘটনা এআই ব্যবস্থার আচরণ কতটা পূর্বানুমানযোগ্য এবং নিরাপদ—সে প্রশ্নকে সামনে এনেছে। 


তবে বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় ‘অস্তিত্বগত ঝুঁকি’ বলতে এই অর্থ নয় যে বর্তমান এআই ইতোমধ্যে মানবজাতিকে ধ্বংস করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। বরং ভবিষ্যতে অত্যন্ত শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কী ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে, সেটিই মূল উদ্বেগ। এ কারণে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।


এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি শুধু মানবজাতির অস্তিত্বের প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়। ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, সাইবার হামলার সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুলের মতো সমস্যাও ইতোমধ্যে আলোচনায় রয়েছে।


গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অত্যন্ত উন্নত এআই যদি বিপুল পরিমাণ মানুষের কাছে লক্ষ্যভিত্তিক বিভ্রান্তিকর তথ্য পৌঁছে দিতে পারে, তাহলে জনমত, নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এর প্রভাব পড়তে পারে। জাতিসংঘের বক্তব্যে যোগাযোগব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সম্ভাব্য বিঘ্নের ঝুঁকিও তুলে ধরা হয়েছে। 


এআইয়ের সামরিক ব্যবহার নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থা এমন প্রযুক্তির উদাহরণ, যেখানে মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই কোনো ব্যবস্থা লক্ষ্য শনাক্ত ও আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান একই বক্তব্যে প্রাণঘাতী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিষিদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন। 


এদিকে এআইয়ের উন্নয়ন নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতাও দ্রুত বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিভিন্ন দেশ এবং বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান উন্নত এআই তৈরিতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। এর ফলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিযোগিতাও জরুরি হয়ে উঠেছে।


বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করেন, কোনো একটি দেশ বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এককভাবে এআইয়ের সম্ভাব্য বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। কারণ এআই প্রযুক্তি সীমান্ত মানে না। একটি দেশে তৈরি প্রযুক্তি অন্য দেশের মানুষ, প্রতিষ্ঠান বা অবকাঠামোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আন্তর্জাতিকভাবে অভিন্ন নিরাপত্তা মানদণ্ড, পরীক্ষা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা প্রয়োজন।


ভলকার তুর্ক এআই উন্নয়ন ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোকে স্পষ্ট ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখা নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন। কোন ধরনের এআই সক্ষমতা গ্রহণযোগ্য এবং কোন পর্যায়ের ঝুঁকি কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়া হবে না—তা আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। 


শক্তিশালী এআই ব্যবস্থার ক্ষেত্রে স্বাধীন নিরাপত্তা পরীক্ষা, উন্নয়ন-পূর্ব ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে কোনো প্রযুক্তির ব্যবহার সাময়িকভাবে বন্ধ করার সক্ষমতা থাকা জরুরি। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও উন্নত এআইয়ের সম্ভাব্য বিপর্যয়কর আচরণ শনাক্ত করতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও নির্দিষ্ট ঝুঁকি-সূচক তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 


এআই মানবজাতির জন্য বিপুল সম্ভাবনাও তৈরি করছে। চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা, কৃষি, যোগাযোগ, শিল্প ও ব্যবসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার মানুষের জীবনকে সহজ করার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। ফলে এআই বন্ধ করে দেওয়া নয়, বরং এর সুবিধা কাজে লাগানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করাই এখন আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

ভলকার তুর্কের সতর্কবার্তার মূল বিষয়ও সেটিই এআইয়ের অগ্রগতি থামানো নয়, বরং প্রযুক্তিটি যাতে মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে না ওঠে, তা নিশ্চিত করা।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর