নিউইয়র্কে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ডে প্যারেড ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা, ব্রুকলিনে বাড়ানো হলো পুলিশের উপস্থিতি

ব্রুকলিনের ঐতিহ্যবাহী ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ডে প্যারেড ঘিরে নিউইয়র্ক পুলিশ বাড়িয়েছে নিরাপত্তা, নির্ধারিত সময়ের আগেই অনুষ্ঠান শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

নিউইয়র্কে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ডে প্যারেড ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা, ব্রুকলিনে বাড়ানো হলো পুলিশের উপস্থিতি

নিউইয়র্কে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ডে প্যারেড ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা, ব্রুকলিনে বাড়ানো হলো পুলিশের উপস্থিতি


যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের ব্রুকলিনে সোমবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ডে প্যারেড। ক্যারিবীয় সংস্কৃতির অন্যতম বৃহৎ এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে এবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ। শ্রমিক দিবসের ছুটিতে লাখো মানুষ ব্রুকলিনে জড়ো হওয়ার প্রত্যাশার মধ্যে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং অনুষ্ঠান পরিচালনায়ও কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। 

প্রতিবছর লেবার ডের দিন ব্রুকলিনের ইস্টার্ন পার্কওয়ে এলাকায় অনুষ্ঠিত এই প্যারেড নিউইয়র্কের ক্যারিবীয় ও প্রবাসী জনগোষ্ঠীর অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। জ্যামাইকা, হাইতি, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, বার্বাডোসসহ ক্যারিবীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি, সংগীত, নৃত্য ও ঐতিহ্য এখানে তুলে ধরা হয়।

এবারের আয়োজনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে নিউইয়র্কের হাইতীয় সম্প্রদায়ের কাছেও। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, হাইতীয় অভিবাসীদের একটি অংশ বর্তমানে অভিবাসন নীতি ও অস্থায়ী সুরক্ষা মর্যাদা বা টিপিএস-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ফলে অনেক অংশগ্রহণকারীর কাছে এবারের প্যারেড শুধু উৎসব নয়, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সম্প্রদায়ের ঐক্য প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষে।

প্যারেড ঘিরে নিরাপত্তা বাড়ানোর অন্যতম কারণ অতীতের সহিংসতার ঘটনাও। নিউইয়র্কে এই আয়োজন সাধারণত বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়। জনসমাগম যত বড় হয়, ততই পুলিশকে রাস্তা নিয়ন্ত্রণ, ভিড় ব্যবস্থাপনা, জরুরি চিকিৎসা এবং সম্ভাব্য অপরাধ প্রতিরোধে অতিরিক্ত প্রস্তুতি নিতে হয়।

নিউইয়র্ক পুলিশ জানিয়েছে, এবারের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি প্যারেড রুটের বিভিন্ন অংশে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ উপস্থিতি জোরদার করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের পুলিশ নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে। 

এবার অনুষ্ঠান আগের তুলনায় কিছুটা আগে শেষ করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তার স্বার্থে প্যারেডের সময়সূচি ও সমাপ্তির সময় নিয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর ফলে সন্ধ্যার দিকে বড় ধরনের জনসমাগম দীর্ঘ সময় ধরে রাখার ঝুঁকি কমবে বলে কর্তৃপক্ষ আশা করছে। 

নিউইয়র্কে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের জন্যও এই খবর গুরুত্বপূর্ণ। ব্রুকলিনের ফ্ল্যাটবুশ, ক্রাউন হাইটস ও আশপাশের এলাকায় বাংলাদেশি এবং দক্ষিণ এশীয়দের বড় একটি সম্প্রদায় রয়েছে। প্যারেডের দিন এসব এলাকায় অতিরিক্ত যানজট, রাস্তা বন্ধ এবং গণপরিবহনে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। যারা কাজ, ব্যবসা বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্রুকলিনের ওই এলাকায় যাতায়াত করবেন, তাঁদের স্থানীয় ট্রাফিক ও পুলিশের নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন।

প্যারেডের সাংস্কৃতিক গুরুত্বও কম নয়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের অনুষ্ঠানে হাইতীয় সাংস্কৃতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একটি বড় হাইতীয় মাস্করেড দল প্রায় ১৮০ জন শিল্পী নিয়ে অংশ নিচ্ছে। আর্থিক সংকট ও স্পনসর সংগ্রহের সমস্যার মধ্যেও দলগুলো সাংস্কৃতিক উপস্থিতি বজায় রাখছে। 

এই আয়োজন নিউইয়র্কে ক্যারিবীয় অভিবাসীদের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতিফলন। বিশেষ করে হাইতীয় সম্প্রদায়ের নিউইয়র্কে বসবাসের ইতিহাস কয়েক দশকের। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকটের সময় হাইতি থেকে বহু মানুষ নিউইয়র্কে এসে বসতি গড়েন। তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মও শহরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। 

তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানোর কারণে উৎসবের পরিবেশে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। আয়োজকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা।

পুলিশের জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় হবে বিপুল জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ। কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত মানুষকে সরিয়ে নেওয়া, অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের রাস্তা খোলা রাখা এবং প্যারেড রুটের বিভিন্ন অংশে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন হবে।

শহরের বাসিন্দাদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাস্তা বন্ধ ও যানবাহন চলাচলের পরিবর্তন। প্যারেডের কারণে ব্রুকলিনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়কে সাময়িক বিধিনিষেধ থাকতে পারে। ফলে ব্যক্তিগত গাড়িচালকদের বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করতে হতে পারে এবং গণপরিবহন ব্যবহারকারীদেরও যাত্রার আগে সময়সূচি যাচাই করা উচিত।

নিউইয়র্ক শহরের এমন বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সাধারণত স্থানীয় ব্যবসার জন্যও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করে। রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান, ছোট ব্যবসা, পরিবহন ও বিভিন্ন সেবাখাতের মানুষ অতিরিক্ত গ্রাহক পেতে পারেন। ফলে নিরাপত্তা ও জনসমাগমের পাশাপাশি প্যারেডটি স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে।

এবারের আয়োজনের রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্বও রয়েছে। অভিবাসন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান বিতর্কের মধ্যে ক্যারিবীয় সম্প্রদায়ের মানুষ তাঁদের সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রকাশের সুযোগ হিসেবে এই প্যারেডকে দেখছেন। বিশেষ করে হাইতীয় সম্প্রদায়ের জন্য এটি কঠিন সময়েও নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রাখার একটি প্রতীকী আয়োজন।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর