মিয়ামি বিমানবন্দরে অ্যামাজনের কার্গো বিমান বিধ্বস্ত, পাঁচজন নিহতের পর নতুন তদন্ত চলছে
মিয়ামি বিমানবন্দরে অ্যামাজনের কার্গো বিমান রানওয়ে ছাড়িয়ে যানবাহনে আঘাত করে পাঁচজন নিহত, পাঁচজন আহত; দুর্ঘটনার কারণ খুঁজছে তদন্তকারীরা এখন সেখানে।
মিয়ামি বিমানবন্দরে অ্যামাজনের কার্গো বিমান বিধ্বস্ত, পাঁচজন নিহতের পর নতুন তদন্ত চলছে
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অ্যামাজনের হয়ে পরিচালিত একটি কার্গো বিমান রানওয়ে ছাড়িয়ে গিয়ে মাটিতে থাকা একাধিক যানবাহনে আঘাত করার ঘটনায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। দুর্ঘটনার পর সোমবার ৭ সেপ্টেম্বরও বিমানবন্দরের কার্যক্রমে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে এবং বেশ কিছু ফ্লাইট বিলম্বিত ও বাতিল হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যামাজন প্রাইম এয়ারের ফ্লাইট ৭৫৯৮ স্থানীয় সময় রোববার দুপুর প্রায় ২টার দিকে মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় নির্ধারিত রানওয়ে ছাড়িয়ে যায়। বিমানটি পুয়ের্তো রিকোর সান হুয়ান থেকে মিয়ামির উদ্দেশে এসেছিল। এটি ছিল বোয়িং ৭৬৭-৩০০ মডেলের একটি কার্গো বিমান এবং বিমানটি পরিচালনা করছিল ২১ এয়ার।বিমানটি রানওয়ের শেষপ্রান্ত অতিক্রম করে বিমানবন্দরের বাইরের এলাকায় চলে যায় এবং সেখানে থাকা কয়েকটি যানবাহনে আঘাত করে। দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। মিয়ামি-ডেড ফায়ার রেসকিউ জানিয়েছে, ৬০টির বেশি উদ্ধারকারী ইউনিট এবং প্রায় ২০০ জন কর্মী উদ্ধার ও জরুরি কার্যক্রমে অংশ নেন। বিমানটিতে জ্বালানি ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও উদ্ধারকারী দলকে মোকাবিলা করতে হয়েছে।
স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমানের আঘাতে কয়েকটি যানবাহনের ভেতরে থাকা মানুষ আটকা পড়েন। বিমানের পাইলট ও সহকারী পাইলটও দুর্ঘটনার পর বিমানের ভেতরে আটকা পড়েছিলেন। নিহতদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। আহত পাঁচজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানানো হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সব রানওয়ে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ পরে ধাপে ধাপে রানওয়ে চালু করে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম লোকাল টেনের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকালে বিমানবন্দরের চারটি রানওয়ের মধ্যে দুটি চালু ছিল। ওই সময় ৩৬টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বিলম্বিত এবং ৪৩টি ফ্লাইট বাতিল হওয়ার কথা জানানো হয়।
ফলে শুধু দুর্ঘটনাস্থলেই নয়, পুরো বিমানবন্দর ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ে। যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে নিজেদের সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের সঙ্গে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ছুটির সময় ভ্রমণকারীদের জন্য এই সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পরিবহন নিরাপত্তা বোর্ড, অর্থাৎ এনটিএসবি, তদন্ত শুরু করেছে। সংস্থাটি চেয়ারম্যান জেনিফার হোমেন্ডির নেতৃত্বে তদন্তকারী দল মিয়ামিতে পাঠিয়েছে। সোমবার তদন্তকারীদের পক্ষ থেকে প্রাথমিক তথ্য প্রকাশের কথা রয়েছে।
বিমানটির বয়সও তদন্তে একটি বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, দুর্ঘটনাগ্রস্ত বোয়িং ৭৬৭-৩০০ বিমানটির বয়স প্রায় ৩২ বছর। এটি ১৯৯৪ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন এয়ারলাইনের যাত্রীবাহী বিমান হিসেবে পরিচালিত হয়েছিল। পরে এটি কার্গো বিমান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। তবে শুধু বিমানের বয়সের কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো তদন্তকারীরা দেননি।
বিমানটির গতি, অবতরণের সময়কার আবহাওয়া, রানওয়ের পরিস্থিতি, পাইলটের সিদ্ধান্ত, যান্ত্রিক অবস্থা এবং বিমানটি ঠিক কোথায় রানওয়ে ছাড়িয়েছিল—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আসতে পারে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি ব্যবহারযোগ্য রানওয়ে ছাড়ার সময় ঘণ্টায় প্রায় ১২৯ মাইল গতিতে ছিল। তবে এই তথ্য নিজে থেকে দুর্ঘটনার কারণ প্রমাণ করে না।
মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কার্গো কেন্দ্রগুলোর একটি। লাতিন আমেরিকার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যে এই বিমানবন্দরের বড় ভূমিকা রয়েছে। বিমানবন্দরটি যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য পরিবহনের দিক থেকে ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোর অন্যতম। ফলে একটি বড় দুর্ঘটনা শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, পণ্য পরিবহনেও সাময়িক চাপ তৈরি করতে পারে।
অ্যামাজন ও ২১ এয়ার উভয় পক্ষই দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে এবং তদন্তে সহযোগিতা করার কথা জানিয়েছে। অ্যামাজন জানিয়েছে, ঘটনার বিস্তারিত বোঝার জন্য তারা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছে এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তা করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে এনটিএসবি তদন্ত শেষ না করা পর্যন্ত দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অনুমান বা অপ্রমাণিত তথ্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে এটি রানওয়ে ওভাররান বা রানওয়ে ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা হিসেবে নিশ্চিত হলেও কেন বিমানটি রানওয়ের শেষপ্রান্ত অতিক্রম করল, সেটিই এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন।