প্রেমের টানে চীন থেকে সখীপুরে যুবক, বিয়ের আগেই ফিরিয়ে দিল পরিবার
প্রেমের টানে চীন থেকে সখীপুরে তরুণীর বাড়িতে ছুটে আসেন এক যুবক। বিয়ের আগেই ভিসা ও প্রতারণার আশঙ্কায় পরিবার তাঁকে ফিরিয়ে দেয়, তবে আবার আসার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
প্রেমের টানে চীন থেকে সখীপুরে যুবক, বিয়ের আগেই ফিরিয়ে দিল পরিবার
অনলাইনে পরিচয়, নিয়মিত কথাবার্তা, এরপর প্রেম। সেই সম্পর্ককে বাস্তবে রূপ দিতে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন চীনের নাগরিক দং লিয়াং। উদ্দেশ্য ছিল টাঙ্গাইলের সখীপুরের এক তরুণীকে বিয়ে করা। কিন্তু স্বপ্নের সেই বিয়ে শেষ পর্যন্ত আর হয়নি। ভিসার মেয়াদ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং সম্ভাব্য প্রতারণার আশঙ্কায় তরুণীর পরিবার ও স্থানীয়রা তাঁকে আপাতত ফিরে যেতে বলেন।
ঘটনাটি ঘটেছে টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার একটি গ্রামে। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় চীনা যুবক দং লিয়াং ঢাকা থেকে সখীপুরে পৌঁছান। তাঁর আসার খবর পেয়ে ওই তরুণী নিজেই সখীপুর বাজারে গিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান। পরে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে নিজের বাড়িতে যান। বিদেশি একজন যুবক প্রেমিকার বাড়িতে এসেছেন—এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি দ্রুত এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ওই বাড়িতে স্থানীয় লোকজনও ভিড় করতে থাকেন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সিরাজুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় সূত্র ও একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে, প্রায় তিন মাস আগে অনলাইনে একটি অ্যাপের মাধ্যমে দং লিয়াংয়ের সঙ্গে সখীপুরের ওই তরুণীর পরিচয় হয়। প্রথমে তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ ও কথাবার্তা চললেও ধীরে ধীরে তা প্রেমের সম্পর্কে গড়ায়। একপর্যায়ে দুজনেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্যই চীন থেকে বাংলাদেশে আসেন দং লিয়াং।
চীনা যুবকটি ওই তরুণীকে বিয়ে করতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আগ্রহের কথাও জানান। বিয়ের পর তাঁকে চীনে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দং লিয়াংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে আবার বাংলাদেশে আসতে চান এবং পরবর্তী সময়ে ধর্মীয় রীতি মেনে ওই তরুণীকে বিয়ে করার ইচ্ছা রয়েছে।
তবে বিষয়টি যতটা আবেগের ছিল, পরিবারের কাছে ততটাই ছিল উদ্বেগের। বিশেষ করে চীনা নাগরিকটির ভিসার মেয়াদ খুব অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হওয়ার বিষয়টি পরিবারকে ভাবিয়ে তোলে। তরুণীর পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ভিসার মেয়াদ আর মাত্র নয় দিন থাকায় এত অল্প সময়ের মধ্যে বিয়ে সম্পন্ন করে তাঁকে চীনে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা কঠিন।
এর সঙ্গে যোগ হয় আরও একটি আশঙ্কা। বর্তমান সময়ে বিদেশি নাগরিক পরিচয়ে প্রতারণা, বিয়ের প্রলোভন কিংবা মানব পাচারের মতো বিভিন্ন ঘটনার কথা বিবেচনায় নিয়ে পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত না হয়ে মেয়েটির বিয়ে দিতে চাননি। তাঁরা দং লিয়াংয়ের পরিচয়, ভিসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে দং লিয়াংকে বলা হয়, তিনি আপাতত চীনে ফিরে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ভিসার ব্যবস্থা করুন। এরপর বৈধ কাগজপত্র নিয়ে আবার বাংলাদেশে এলে বিয়ের বিষয়ে নতুন করে আলোচনা করা হবে। অর্থাৎ পরিবার সরাসরি বিয়ের সম্ভাবনা বাতিল করেনি; বরং আগে তাঁর পরিচয় ও কাগজপত্র নিশ্চিত হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও আলোচনা শুরু হলে বিষয়টি সখীপুর থানাকে জানানো হয়। পরে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আলোচনা করে দং লিয়াংকে নিরাপদে ঢাকায় চীনা দূতাবাসের উদ্দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, রাতের দিকে একটি গাড়ি ভাড়া করে তাঁকে ঢাকার দিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
সখীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুরাদ হোসেন জানান, তরুণী যাতে কোনো ধরনের প্রতারণার শিকার না হন, সে জন্য স্থানীয় লোকজন সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টি দেখেছেন। স্থানীয়রা আলোচনা করে ওই যুবককে চীনা দূতাবাসে পাঠিয়ে দেওয়ার বিষয়টি তাঁকে জানিয়েছেন।
এদিকে দং লিয়াংয়ের বক্তব্যও ঘটনাটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর ব্যবস্থা করে তিনি আবার বাংলাদেশে ফিরে আসবেন। এরপর ধর্মীয় নিয়ম মেনে ওই তরুণীকে বিয়ে করার ইচ্ছা তাঁর রয়েছে। ফলে আপাতত তাঁদের প্রেমের গল্প থেমে গেলেও ভবিষ্যতে এই সম্পর্কের পরিণতি কী হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
স্থানীয়দের কাছে ঘটনাটি যেমন কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে, তেমনি পরিবারের সতর্কতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ আন্তঃদেশীয় বিয়ের ক্ষেত্রে শুধু পারস্পরিক ভালোবাসা বা সম্পর্কের বিষয়টি নয়, দুই দেশের আইন, বৈধ ভিসা, পরিচয়পত্র, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা এবং পরবর্তী সময়ে বিদেশে বসবাসের আইনি প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিবারটি আবেগের সিদ্ধান্ত না নিয়ে আগে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো যাচাই করতে চেয়েছে।
সব মিলিয়ে, অনলাইন পরিচয় থেকে শুরু হওয়া এই সম্পর্কের কারণে চীন থেকে সখীপুরে ছুটে আসা দং লিয়াংকে শেষ পর্যন্ত বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই ফিরে যেতে হয়েছে। তবে তাঁর দাবি অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ভিসার ব্যবস্থা করতে পারলে তিনি আবার বাংলাদেশে আসবেন। তখনই হয়তো জানা যাবে, সখীপুরের তরুণী ও চীনা যুবকের এই অনলাইন প্রেম বাস্তবে বিয়ের বন্ধনে গড়ায় কি না।