খার্গ দ্বীপের কাছে ইরানি ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি, বাড়ছে সংঘাতের শঙ্কা
খার্গ দ্বীপের কাছে ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার দাবি ঘিরে নতুন উত্তেজনা, হতাহতের খবর নেই, তবে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ বাড়ছে।
খার্গ দ্বীপের কাছে ইরানি ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি, বাড়ছে সংঘাতের শঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের কাছে একটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি উঠেছে। ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম বার্তা সংস্থার বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ৫ সেপ্টেম্বর খার্গ দ্বীপের কাছে থাকা একটি ইরানি তেলবাহী জাহাজে চারটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এ ঘটনায় কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। জাহাজটির নাবিকদের সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত হামলার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। ফলে হামলার সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
খার্গ দ্বীপ ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পারস্য উপসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপটি দেশটির প্রধান তেল রপ্তানি অবকাঠামোর অন্যতম কেন্দ্র। অতীতে ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির বড় একটি অংশ এই এলাকার অবকাঠামোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে যেত। ফলে খার্গ দ্বীপের আশপাশে সামরিক কর্মকাণ্ড বাড়লে শুধু ইরানের তেল শিল্প নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অনেক। এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন করা হয়। সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে তেলের দামে।
নতুন এই হামলার দাবি এমন সময়ে সামনে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাত আবারও তীব্র হয়েছে। এর আগে মার্কিন বাহিনী ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে। পাল্টা ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও বাড়তে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৯৭ ডলারের কাছাকাছি উঠেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে বাজার বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন।
তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবহন ব্যয়, পণ্য পরিবহন, কৃষি উৎপাদন এবং খাদ্যপণ্যের দামেও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম ইতিমধ্যে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হলে আমেরিকান ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইরানের তেল অবকাঠামোকে ঘিরে সামরিক হামলার ঘটনা আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বড় তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পাশাপাশি বীমা ব্যয় বৃদ্ধি, জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং বিকল্প পথে তেল পরিবহনের প্রয়োজনীয়তা বিশ্ববাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
তবে এই মুহূর্তে হামলার খবরকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। কারণ প্রাথমিক তথ্যটি এসেছে ইরানের একটি আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম থেকে এবং রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার বিষয়ে ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। তাই ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা, হামলার সুনির্দিষ্ট স্থান, জাহাজটির পরিচয় এবং ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্যের অপেক্ষা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষ এ ঘটনার বিষয়ে কী বক্তব্য দেয় এবং ইরান পরবর্তী সময়ে কী প্রতিক্রিয়া জানায়। যদি হামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয় এবং পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাহলে সংঘাত আরও বড় আকার নেওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিশেষ করে খার্গ দ্বীপ ও হরমুজ প্রণালির আশপাশে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক দেশগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে এখন আন্তর্জাতিক বাজার ও কূটনৈতিক মহলের নজর রয়েছে।