আমেরিকায় চাকরির বাজারে নতুন সংকেত, নিয়োগ ধীর হলেও ছাঁটাই এখনো ঐতিহাসিকভাবে কম
চাকরির সুযোগ মোটামুটি স্থির থাকলেও নিয়োগের গতি কমেছে, ফলে কর্মপ্রার্থীদের প্রতিযোগিতা বাড়ছে এবং অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
আমেরিকায় চাকরির বাজারে নতুন সংকেত, নিয়োগ ধীর হলেও ছাঁটাই এখনো ঐতিহাসিকভাবে কম
যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বাজারে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে কর্মীদের ছাঁটাই তুলনামূলকভাবে কম হলেও নতুন কর্মী নিয়োগের গতি আগের তুলনায় ধীর। শ্রমবাজারের এই অবস্থাকে অর্থনীতিবিদরা অনেকটা “ধীরে নিয়োগ, ধীরে ছাঁটাই” পরিস্থিতি হিসেবে দেখছেন। সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শেষ সপ্তাহে নতুন বেকারভাতা আবেদনের সংখ্যা সামান্য বেড়ে ২ লাখ ৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে। তবে এই সংখ্যা এখনো ঐতিহাসিকভাবে নিচু পর্যায়ে রয়েছে।
শ্রমবাজারের এই চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, চাকরি হারানোর ঘটনা এখনো ব্যাপক আকার নেয়নি। ২৯ আগস্ট শেষ হওয়া সপ্তাহে নতুন বেকারভাতা আবেদন আগের সংশোধিত ২ লাখ ৪ হাজার থেকে বেড়ে ২ লাখ ৬ হাজার হয়েছে। চার সপ্তাহের গড়ও সামান্য বেড়ে ২ লাখ ৭ হাজার ২৫০ হয়েছে। অর্থাৎ সপ্তাহভিত্তিক কিছু ওঠানামা থাকলেও বড় ধরনের ছাঁটাইয়ের ঢেউ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
তবে চাকরিপ্রার্থীদের জন্য সমস্যাটি অন্য জায়গায়। কোম্পানিগুলো কর্মী ছাঁটাই না করলেও নতুন কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে আগের মতো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সর্বশেষ শ্রমবাজারের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে মোট নিয়োগের সংখ্যা কমেছে। নতুন কর্মী নিয়োগের এই ধীরগতি চাকরিপ্রার্থীদের জন্য সুযোগ পাওয়া কঠিন করে তুলছে। বিশেষ করে যারা চাকরি হারানোর পর নতুন কর্মসংস্থানের চেষ্টা করছেন, তাদের অপেক্ষার সময় দীর্ঘ হতে পারে।
জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ছাঁটাই ও চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার সংখ্যা ১ লাখ ৬৬ হাজারের মতো ছিল, যা আগের মাসের তুলনায় কম। ছাঁটাইয়ের হারও ১ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ নিয়োগদাতারা এখনো কর্মীদের ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। এর পেছনে মহামারির পরের শ্রমিক সংকটের অভিজ্ঞতা একটি কারণ হতে পারে। অনেক প্রতিষ্ঠান অতীতে কর্মী হারিয়ে আবার দ্রুত নিয়োগ দিতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছিল। ফলে এখন তারা কর্মী ছাঁটাইয়ের বিষয়ে তুলনামূলকভাবে সতর্ক।
কিন্তু একই সময়ে নতুন নিয়োগ কমে যাওয়ায় শ্রমবাজারের ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে। আগে যেখানে কর্মী খোঁজা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় সমস্যা ছিল, এখন অনেক ক্ষেত্রে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যেই প্রতিযোগিতা বাড়ছে। অর্থনীতিবিদদের কাছে এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শ্রমবাজারের দুর্বলতা সাধারণত ভোক্তা ব্যয়, ব্যবসায়িক আস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বেকারভাতা গ্রহণকারীর সংখ্যাও কিছুটা বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৭ লাখ ৮০ হাজার মানুষ বেকারভাতা গ্রহণ করছেন বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে। আগের সপ্তাহের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার বেশি। যদিও মোট সংখ্যা শ্রমবাজারের আকারের তুলনায় বিশাল নয়, তবুও ধারাবাহিক পরিবর্তনগুলো অর্থনীতিবিদরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বাজার নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে চাকরির শূন্যপদ থেকে। জুলাই মাসে চাকরির সুযোগ মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। তবে আগের মাসের তথ্য বড় ধরনের সংশোধনের পর সামগ্রিক চিত্র কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। একই সময়ে ছাঁটাই কমেছে। ফলে শ্রমবাজার পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়েছে—এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যায় না। বরং বাজারে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারকে বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পর্যায়ে দেখছেন। একদিকে মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদহার এবং বাণিজ্যনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে। কিছু প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মীসংখ্যা কমিয়ে খরচ নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে ভবিষ্যতে কোন ধরনের চাকরির চাহিদা বাড়বে, সেটিও পরিবর্তিত হতে পারে।
সাম্প্রতিক তথ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিকল্পিত ছাঁটাই। আগস্টে পরিকল্পিত চাকরি কমানোর ঘোষণা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। তবে বাস্তবে ছাঁটাইয়ের সামগ্রিক হার এখনো তুলনামূলকভাবে কম। অর্থাৎ কোম্পানিগুলো ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক হলেও এখনো ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে যায়নি।
চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এর অর্থ কী? সবচেয়ে সহজ ভাষায় বলা যায়—চাকরি পাওয়া অসম্ভব হয়নি, কিন্তু আগের তুলনায় প্রতিযোগিতা কঠিন হচ্ছে। একটি কোম্পানিতে একই পদের জন্য আবেদনকারীর সংখ্যা বাড়তে পারে। নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে। নিয়োগদাতারা অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত যোগ্যতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন।
বিশেষ করে নতুন গ্র্যাজুয়েট ও ক্যারিয়ার পরিবর্তন করতে চাওয়া মানুষের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে। কারণ নিয়োগের গতি কমে গেলে প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত নতুন কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি বাছাই করে। অন্যদিকে দক্ষ কর্মীদের ধরে রাখার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চাকরির বাজারে অভিজ্ঞ কর্মীদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্ত থাকতে পারে।
তবে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রে চাকরির বাজার ধসে পড়ার খবর বলা যাবে না। সর্বশেষ তথ্য সেই দাবি সমর্থন করে না। বরং ছাঁটাই কম এবং নিয়োগ ধীর—এই দুই বাস্তবতা একই সঙ্গে চলছে। আগামী শ্রমবাজারের সরকারি প্রতিবেদন এই প্রবণতা আরও পরিষ্কার করবে।