ইসরাইলকে পশ্চিম তীর ছাড়তে বলল জাতিসংঘ, বসতি উচ্ছেদেরও দাবি জাতিসংঘের মানবাধিকার
ইসরাইলকে পশ্চিম তীর থেকে সরে যেতে বলল জাতিসংঘ, বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ ও ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি রোধে কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান।
ইসরাইলকে পশ্চিম তীর ছাড়তে বলল জাতিসংঘ, বসতি উচ্ছেদেরও দাবি জাতিসংঘের মানবাধিকার
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের বসতি সম্প্রসারণ, ভূমি দখল ও ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার অভিযোগ নিয়ে আবারও কঠোর অবস্থান জানিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর বলেছে, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের অবৈধ উপস্থিতি অবসান করতে হবে এবং ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীদের সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সাম্প্রতিক এই অবস্থান এমন এক সময়ে এসেছে, যখন পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের মার্চ ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইল সরকার অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে বসতি সম্প্রসারণ এবং ভূখণ্ড সংযুক্ত করার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করেছে। ওই প্রতিবেদনে এক বছরের মধ্যে ৩৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
জাতিসংঘের অবস্থানের কেন্দ্রে রয়েছে ইসরাইলি বসতি স্থাপন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৩৩৪ নম্বর প্রস্তাব অনুযায়ী, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি বসতি স্থাপনের কোনো আইনি বৈধতা নেই এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড অবিলম্বে ও সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। ২০২৬ সালেও নিরাপত্তা পরিষদে এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের সর্বশেষ সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষকে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি স্থাপন ও সম্প্রসারণ অবিলম্বে বন্ধ এবং আগের সম্প্রসারণও প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে পূর্ব জেরুজালেমসহ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
পশ্চিম তীরে শুধু বসতি সম্প্রসারণ নয়, ফিলিস্তিনিদের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ৯২৫টি চলাচল-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শনাক্ত করা হয়েছিল। জাতিসংঘের হিসাবে, এটি গত দুই দশকের গড়ের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি।
জাতিসংঘ আরও জানিয়েছে, বসতিস্থাপনকারীদের হামলা এবং সংশ্লিষ্ট প্রবেশাধিকার-সংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে পশ্চিম তীরের অন্তত ৪৫টি ফিলিস্তিনি সম্প্রদায় সম্পূর্ণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৬ সালেই নয়টি সম্প্রদায় বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে পশ্চিম তীরে সহিংসতার ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। ২ সেপ্টেম্বর আল-মুঘাইয়ির এলাকায় ১৬ ও ১৯ বছর বয়সী দুই ফিলিস্তিনি তরুণ নিহত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে নতুন করে আলোচনায় আসে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ঘটনায় ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারী ও সেনাদের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, পাথর নিক্ষেপের সঙ্গে জড়িত একটি সহিংস পরিস্থিতির জবাব দিতে তারা গুলি চালিয়েছিল এবং ঘটনাটি তদন্তাধীন।
এই ঘটনার পর জাতিসংঘও পশ্চিম তীরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে বসতিস্থাপনকারীদের হামলা, বাড়িঘর ও সম্পত্তির ক্ষতি এবং বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি আন্তর্জাতিক মহলের নজরে রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পশ্চিম তীরের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো নতুন বসতি প্রকল্প। বিশেষ করে ই১ নামে পরিচিত এলাকার বসতি পরিকল্পনা নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি কার্যক্রমের জবাবে তারা নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ব্রিটিশ সরকারের মতে, ই১ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে “জাতিসংঘ ইসরাইলকে পশ্চিম তীর থেকে বের হয়ে যাওয়ার নতুন বাধ্যতামূলক নির্দেশ দিয়েছে”—এভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা পুরোপুরি সঠিক হবে না। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং সাধারণ পরিষদের অবস্থান একদিকে, আর নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত অন্যদিকে—দুটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি। সাম্প্রতিক জাতিসংঘের মানবাধিকার অবস্থান মূলত ইসরাইলের অধিকৃত ভূখণ্ডে অবৈধ বসতি, দখলদারিত্ব ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বন্ধের আহ্বানকে আরও জোরালো করেছে।
জাতিসংঘের এই অবস্থানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ২০২৪ সালের পরামর্শমূলক মতামতের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত। আদালত অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি এবং বসতি নীতির বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে গুরুতর আপত্তি জানিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদও ইসরাইলের অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ উপস্থিতি অবসানের দাবি জানিয়েছে।
পশ্চিম তীর এখন ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। একদিকে বসতি সম্প্রসারণ, অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি ও সহিংসতা—সবকিছু মিলিয়ে দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। জাতিসংঘের বক্তব্যে তাই শুধু বসতি বন্ধের দাবি নয়, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমাধানের জন্য ভূখণ্ডের ধারাবাহিকতা রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।