সিরিয়ায় আসাদ আমলের রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস শুরু, ফিরছে আন্তর্জাতিক নজরদারি
সিরিয়ার নতুন নেতৃত্ব সাবেক শাসনামলের রাসায়নিক অস্ত্রের অবশিষ্টাংশ ধ্বংস শুরু করেছে, জাতিসংঘ বলছে পদক্ষেপটি আঞ্চলিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ।
সিরিয়ায় আসাদ আমলের রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস শুরু, ফিরছে আন্তর্জাতিক নজরদারি
সিরিয়ায় সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের আমলের গোপন রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির অবশিষ্টাংশ ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। জাতিসংঘ ও রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংস্থার যাচাইয়ের মাধ্যমে এই ধ্বংস কার্যক্রম শুরু হওয়াকে সিরিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে এক দশকের বেশি সময় পর সিরিয়ার মাটিতে রাসায়নিক অস্ত্রের অবশিষ্ট উপকরণ ধ্বংসের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণবিষয়ক কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংস্থা ৪২টি আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য বোমা ধ্বংসের বিষয়টি যাচাই করেছে। পাশাপাশি রাসায়নিক অস্ত্র উৎপাদন ও সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত আরও কিছু স্থাপনা ও উপকরণ শনাক্ত ও ধ্বংস করার কাজ চলছে।
এই পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের ভয়াবহ ইতিহাস। যুদ্ধ চলাকালে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছিল। বিশেষ করে ২০১৩ সালের পূর্ব ঘৌটা হামলার পর সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র চাপ তৈরি হয়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক চাপে সিরিয়া রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংস্থার সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ ছিল, সাবেক সরকার তাদের রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির সব তথ্য পুরোপুরি প্রকাশ করেনি। ফলে আগের ধ্বংস কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরও কিছু অস্ত্র, উপকরণ ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনা গোপনে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
২০২৬ সালের মে মাসে সিরিয়ার নতুন নেতৃত্ব এমন কিছু কাঁচামাল ও অস্ত্রের সন্ধান পাওয়ার কথা জানায়, যেগুলোকে সাবেক রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। এরপর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সহায়তায় সেগুলো শনাক্ত ও ধ্বংস করার কার্যক্রম শুরু হয়।
জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণবিষয়ক কর্মকর্তা ইজুমি নাকামিৎসু জানিয়েছেন, রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংস্থার যাচাইয়ের মাধ্যমে ধ্বংস কার্যক্রমের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া গেছে। ২০১৪ সালের পর প্রথমবারের মতো সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্রসংক্রান্ত গোলাবারুদ ধ্বংসের বিষয়টি সংস্থাটি যাচাই করেছে।
সিরিয়ার নতুন নেতৃত্ব এই উদ্যোগকে শুধু দেশীয় নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে দেখছে না। তাদের বক্তব্য, রাসায়নিক অস্ত্রের অবশিষ্টাংশ ধ্বংস করা হলে এসব বিপজ্জনক উপকরণ ভুল হাতে পড়ার ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাও বাড়বে।
তবে এই কাজ সহজ নয়। বহু বছর ধরে যুদ্ধের কারণে সিরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক জায়গায় নিরাপত্তা পরিস্থিতিও অস্থিতিশীল। রাসায়নিক অস্ত্রের মতো অত্যন্ত বিপজ্জনক উপকরণ শনাক্ত, পরিবহন ও ধ্বংস করতে বিশেষজ্ঞ দল এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সিরিয়ার জাতিসংঘ প্রতিনিধি আরও অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েলি সামরিক কর্মকাণ্ডের কারণে কিছু এলাকায় রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংসের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে। তবে এই অভিযোগের পাশাপাশি সিরিয়ার নতুন সরকার রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এই উদ্যোগের সঙ্গে জবাবদিহিতার বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। সিরিয়া সাবেক রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতিবেদনে ১৮ জন সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে, যাদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিও রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রও সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বকে রাসায়নিক অস্ত্র নিষ্পত্তির কাজে আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে। ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে, এই কর্মসূচি ধ্বংস করা শুধু সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
রাশিয়া ও চীনও সিরিয়ার অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাসায়নিক অস্ত্রের অবশিষ্টাংশ ধ্বংসের এই উদ্যোগ সিরিয়ার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিতে পারে।
তবে কাজটি পুরোপুরি শেষ হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ এখনো নেই। বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়ার শুরু। কোথায় আরও অস্ত্র বা উপকরণ রয়েছে, সেগুলো কতটা নিরাপদে ধ্বংস করা যাবে এবং ভবিষ্যতে সিরিয়া তার আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে এই উদ্যোগ কতটা সফল হয়েছে।