তিনগুণ হচ্ছে ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোর বড় উদ্যোগ
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ERL) সক্ষমতা তিনগুণ করার উদ্যোগ অবশেষে বাস্তবায়নের পথে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের বর্তমান সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে ৪৫ লাখ টনে। অর্থাৎ বিদ্যমান সক্ষমতার সঙ্গে আরও ৩০ লাখ টন যুক্ত হবে
তিনগুণ হচ্ছে ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোর বড় উদ্যোগ
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ERL) সক্ষমতা তিনগুণ করার উদ্যোগ অবশেষে বাস্তবায়নের পথে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের বর্তমান সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে ৪৫ লাখ টনে। অর্থাৎ বিদ্যমান সক্ষমতার সঙ্গে আরও ৩০ লাখ টন যুক্ত হবে।
প্রকল্পটির সর্বশেষ সংশোধিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩১,০০০.৫৭ কোটি টাকা। এর আগে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৫,৪৬৫ কোটি টাকা; পরবর্তী পর্যালোচনায় তা প্রায় ৪,৪৬৫ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
উৎপাদন বাড়বে, বদলাবে জ্বালানি সরবরাহের চিত্র
সম্প্রসারণের পর নতুন ইউনিটে বছরে প্রায় ১১ লাখ টন ইউরো-৫ মানের ডিজেল এবং ৬ লাখ টন ইউরো-৫ গ্যাসোলিন উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৫ লাখ টন জেট ফুয়েল, ৪ লাখ টন ফার্নেস অয়েল, ৬০ হাজার টন LPG এবং ২ লাখ টন লুব বেস অয়েল উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হবে। বিদ্যমান রিফাইনারিতে উৎপাদিত ডিজেল, মোটর স্পিরিট ও অকটেনও, ইউরো -৫ মানে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে দেশের মোট পেট্রোলিয়াম পণ্যের চাহিদার মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে পূরণ হয়; বাকি অংশ আমদানিনির্ভর। নতুন সম্প্রসারণ বাস্তবায়িত হলে পরিকল্পনা কমিশনের হিসাবে নতুন ৩০ লাখ টন রিফাইনিং সক্ষমতা জাতীয় পেট্রোলিয়াম পণ্যের চাহিদার প্রায় ৪৫–৫০ শতাংশ পর্যন্ত পূরণে সক্ষম হতে পারে।
এর ফলে বিদেশ থেকে প্রস্তুত ডিজেল, পেট্রোলসহ পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অপরিশোধিত তেল দেশে এনে পরিশোধনের মাধ্যমে মূল্য সংযোজন হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ও হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় কৌশলগত পরিবর্তন
ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ শুধু উৎপাদন বাড়ানোর প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, পরিবহন ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকট সরাসরি দেশের জ্বালানি বাজারকে প্রভাবিত করে।
নতুন রিফাইনারি চালু হলে সেই নির্ভরতা কিছুটা কমবে। একই সঙ্গে একাধিক উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করে পরিশোধনের সুযোগ তৈরি হবে। প্রকল্পের নকশায় মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন উৎসের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতাও রাখা হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (BPC) Single Point Mooring বা SPM ও Double Pipeline প্রকল্পের মাধ্যমে বছরে সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিবহনের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ফলে সম্প্রসারিত রিফাইনারির প্রয়োজনীয় crude সরবরাহের অবকাঠামোগত ভিত্তিও প্রস্তুত।
৩১ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ, সামনে ঋণের দায়ও
প্রকল্পের অর্থায়নে সরকারের পাশাপাশি ইস্টার্ন রিফাইনারি ও BPC-এর নিজস্ব অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (IsDB) প্রায় ১.০০০৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়ার অনুমোদন পেয়েছে। তবে ঋণটির অর্থায়ন ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এটিকে ‘অত্যন্ত কম সুবিধাপূর্ন ঋণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ। ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ২০ বছর, যার মধ্যে পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড।
অর্থাৎ প্রকল্পটি একদিকে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করছে, অন্যদিকে বিপুল বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করতে রিফাইনারির পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার, দক্ষ পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে crude ও refined product-এর দামের পার্থক্য সঠিকভাবে কাজে লাগানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান
ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের পরিকল্পনা প্রথম নেওয়া হয়েছিল প্রায় দেড় দশক আগে। অর্থায়ন, প্রকল্প কাঠামো ও বাস্তবায়ন নিয়ে দীর্ঘ জটিলতার পর এবার আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসেছে। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ERL-এর বড় ধরনের সম্প্রসারণ এতদিন না হওয়ায় দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় আমদানির ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বেড়েছে।
সার্বিকভাবে, ERL সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বর্তমান ১৫ লাখ টন থেকে ৪৫ লাখ টনে crude refining capacity বৃদ্ধি শুধু তিনগুণ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করবে না; এটি দেশে ইউরো -৫ মানের জ্বালানি উৎপাদন, আমদানিনির্ভরতা হ্রাস, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে। তবে প্রকল্পের প্রকৃত অর্থনৈতিক সাফল্য নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণ শেষ করা এবং পূর্ণ ৪৫ লাখ টন সক্ষমতা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারার ওপর।