আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে বেসরকারি চাকরি বেড়েছে মাত্র ৩৮ হাজার, বাড়ছে উদ্বেগ
আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি খাতে প্রত্যাশার চেয়ে কম চাকরি তৈরি হয়েছে, শ্রমবাজারের গতি ধীর হওয়ার নতুন সংকেত মিলেছে।
আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে বেসরকারি চাকরি বেড়েছে মাত্র ৩৮ হাজার, বাড়ছে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে আগস্ট মাসে নতুন চাকরি তৈরির গতি প্রত্যাশার তুলনায় কম ছিল। বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৩৮ হাজার, যেখানে অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস ছিল প্রায় ৪৮ হাজার নতুন চাকরি। এই তথ্য প্রকাশ করেছে এডিপি। নতুন পরিসংখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়েছে এমন প্রমাণ নয়, তবে কর্মসংস্থানের গতি যে ধীর হচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এডিপির তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে প্রায় ৪৫ হাজার চাকরি বেড়েছে। অবসর ও আতিথেয়তা খাতে ১৬ হাজার এবং নির্মাণ খাতে ১২ হাজার চাকরি যুক্ত হয়েছে। আর্থিক কর্মকাণ্ডে চাকরি বেড়েছে প্রায় ৬ হাজার। অন্যদিকে উৎপাদন খাতে ১৭ হাজার এবং পেশাগত ও ব্যবসায়িক সেবায় ১৬ হাজার চাকরি কমেছে।
এই সংখ্যাগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ভোক্তা ব্যয় ও শ্রমবাজারের অবস্থার সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ কাজ পেলে আয় করে, আয় বাড়লে পণ্য ও সেবায় ব্যয় করে এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমও সক্রিয় থাকে। বিপরীতে চাকরির গতি দীর্ঘসময় দুর্বল হলে অর্থনীতিতে চাপ বাড়তে পারে।
তবে শুধু এক মাসের এডিপি প্রতিবেদন দিয়ে পুরো শ্রমবাজারের চূড়ান্ত চিত্র পাওয়া যায় না। সরকারি চাকরি, বেসরকারি চাকরি, কর্মঘণ্টা, মজুরি, শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ এবং বেকারত্বসহ অনেক সূচক একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হয়।
এ কারণেই এখন সবার নজর ৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিতব্য সরকারি কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের দিকে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো জানিয়েছে, আগস্টের পূর্ণাঙ্গ কর্মসংস্থান প্রতিবেদন ৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৮টায় প্রকাশিত হবে। সেখানে বেসরকারি ও সরকারি খাত মিলিয়ে মোট চাকরি, বেকারত্ব এবং অন্যান্য শ্রমবাজার সূচকের বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যাবে।
চাকরির বাজারে ধীরগতির সম্ভাব্য কারণ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এডিপির প্রতিবেদনে আমদানি শুল্ক এবং অভিবাসন নীতিকে ব্যবসার পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরি কমে যাচ্ছে কি না, সেটিও আলোচনায় রয়েছে। তবে এডিপির তথ্য থেকে এখনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বড় আকারে চাকরি হারানোর সরাসরি কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি।
উৎপাদন খাতে ১৭ হাজার চাকরি কমে যাওয়াও নজর কেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পখাত ইতিমধ্যে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা, আমদানি ব্যয় এবং বাণিজ্যনীতির পরিবর্তনের প্রভাবের মুখোমুখি। ফলে উৎপাদন খাতে নিয়োগের গতি কমে গেলে সেটি শিল্পখাতের ব্যবসায়িক আস্থার ওপরও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে চাকরি বৃদ্ধির বিষয়টি ইতিবাচক। এই খাতগুলোতে মানুষের প্রয়োজন তুলনামূলক স্থিতিশীল হওয়ায় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ও কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। অবসর ও আতিথেয়তা খাতেও চাকরি বৃদ্ধি দেখাচ্ছে, পর্যটন ও ভোক্তা ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসাগুলো এখনো কর্মী নিয়োগ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পর্যটন শিল্পও শ্রমবাজারের সঙ্গে যুক্ত। আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা কমে গেলেও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ব্যবসা লাখ লাখ কর্মসংস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন ভ্রমণশিল্পের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করে বিদেশি পর্যটক বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছে।
চাকরির বাজারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অভিবাসন। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী শ্রমিকরা নির্মাণ, কৃষি, আতিথেয়তা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে অভিবাসন নীতির পরিবর্তন শ্রম সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এডিপির প্রতিবেদনে শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন কিছু নীতিগত প্রভাবের কথাও আলোচনায় এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চাকরি কমছে, নাকি শুধু নিয়োগের গতি স্বাভাবিক হচ্ছে? ৩৮ হাজার নতুন চাকরি যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল শ্রমবাজারের তুলনায় খুব বড় সংখ্যা নয়। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে কয়েক মাস চাকরি সৃষ্টির গতি কম থাকলে সেটি অর্থনীতির দুর্বলতার গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হয়ে উঠতে পারে।
বেকারত্বের হারও গুরুত্বপূর্ণ। জুলাইয়ের সরকারি কর্মসংস্থান প্রতিবেদনে পরবর্তী সরকারি সংশোধনের প্রভাব দেখা গেছে এবং মে ও জুনের চাকরি বৃদ্ধির হিসাব আগের তুলনায় কমিয়ে সংশোধন করা হয়েছে। এর ফলে শ্রমবাজারের আগের শক্তিশালী চিত্র কিছুটা দুর্বল হয়েছে।
এখন ৪ সেপ্টেম্বরের সরকারি প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে আছে বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী, চাকরিপ্রার্থী এবং নীতিনির্ধারকরা। যদি সরকারি প্রতিবেদনে প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল চাকরি সৃষ্টি দেখা যায়, তাহলে অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে। বিপরীতে ভালো কর্মসংস্থান সংখ্যা এডিপির দুর্বল ফলকে সাময়িক বিচ্যুতি হিসেবে দেখানোর সুযোগ দেবে।
সুতরাং আগস্টের ৩৮ হাজার চাকরি এখনই যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে সংকট ঘোষণা করার মতো তথ্য নয়। বরং এটি এমন একটি সতর্ক সংকেত, যা আগামী সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।