শিশুর পাসপোর্ট পেতে বাবা-মায়ের নাগরিকত্বের প্রমাণ চাওয়ার প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রে
যুক্তরাষ্ট্রে শিশুর পাসপোর্ট আবেদনে বাবা-মায়ের নাগরিকত্ব বা অভিবাসন অবস্থার প্রমাণ চাওয়ার প্রস্তাব নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
শিশুর পাসপোর্ট পেতে বাবা-মায়ের নাগরিকত্বের প্রমাণ চাওয়ার প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রে
যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়ায় বাবা-মায়ের নাগরিকত্ব বা অভিবাসন অবস্থার অতিরিক্ত প্রমাণ চাওয়ার একটি প্রস্তাব নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রস্তাবটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার বৃহত্তর নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি বর্তমানে প্রস্তাবিত ব্যবস্থা, সবার জন্য কার্যকর হয়ে যাওয়া নতুন পাসপোর্ট আইন নয়।
রয়টার্স জানিয়েছে, শিশুদের পাসপোর্টের আবেদন করার সময় বাবা-মাকে নিজেদের নাগরিকত্ব বা যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ অভিবাসন অবস্থার প্রমাণ দিতে বলা হতে পারে। প্রস্তাবটি বিশেষ করে এমন পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, যেখানে শিশুটি যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেছে কিন্তু তার বাবা-মায়ের কেউ বা দুজনই মার্কিন নাগরিক নন।
বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর নাগরিকত্ব ধারা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের নাগরিকত্বের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই নীতির সীমা পরিবর্তনের চেষ্টা করছে।
আগস্টে ট্রাম্প একটি নতুন নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। সেখানে নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির শিশুদের জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আনার চেষ্টা করা হয়। আদেশে বিদেশি সরকারের কর্মী, নির্দিষ্ট বিদেশি শত্রু হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের সন্তান এবং তথাকথিত জন্ম-পর্যটনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব অর্জনের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আসা কিছু পরিবারের সন্তানদের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত আদেশেও এসব শ্রেণির কথা উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু এই নতুন নির্বাহী আদেশও আদালতের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মেরিল্যান্ডের ফেডারেল বিচারক ডেবোরা বোর্ডম্যান ২ সেপ্টেম্বর প্রশাসনের আদেশ কার্যকর করার ওপর প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। তিনি মনে করেছেন, মামলাকারীরা তাদের সাংবিধানিক দাবিতে সফল হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা দেখাতে পেরেছেন।
এই আদালতের সিদ্ধান্ত পাসপোর্টের প্রস্তাবিত নিয়মকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কারণ নাগরিকত্বের প্রশ্ন শুধু জন্মনিবন্ধন বা নাগরিকত্ব সনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পাসপোর্ট আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে নাগরিকত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দলিল। ফলে পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়ায় বাবা-মায়ের পরিচয় বা অবস্থান সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য চাওয়া হলে অভিবাসী পরিবারগুলোকে নতুন নথি প্রস্তুত করতে হতে পারে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে কিছু বিভ্রান্তিকর দাবি ছড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে “এখন থেকে আমেরিকায় জন্ম নেওয়া কোনো শিশুই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাসপোর্ট পাবে না”—এ ধরনের সরলীকৃত বক্তব্য সঠিক নয়। প্রস্তাবটি কীভাবে কার্যকর হবে, কোন পরিবার এতে পড়বে এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হবে—এসব বিষয় এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
পাসপোর্টের ক্ষেত্রে একটি বিষয়ও আলাদা করে বোঝা দরকার। শিশুর নাগরিকত্ব এবং শিশুর পাসপোর্ট দুটি একই বিষয় নয়। নাগরিকত্বের আইনি ভিত্তি আলাদা, আর পাসপোর্ট হলো আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সরকারি দলিল। কোনো শিশুর পাসপোর্ট আবেদনে অতিরিক্ত নথি চাওয়া হলে সেটি সরাসরি নাগরিকত্ব বাতিলের সমান নয়।
এই বিতর্কে অভিবাসী পরিবারগুলোর উদ্বেগও স্বাভাবিক। বিশেষ করে যেসব পরিবারে বাবা-মায়ের অভিবাসন প্রক্রিয়া চলমান, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নথিপত্রের প্রয়োজন হলে আবেদন প্রক্রিয়া আরও জটিল হতে পারে। পরিবারের সদস্যদের নাগরিকত্ব, বৈধ অবস্থান এবং সন্তানের জন্মসংক্রান্ত তথ্য একসঙ্গে যাচাই করার প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে প্রশাসনের যুক্তি হলো, নাগরিকত্বের সরকারি নথি তৈরির ক্ষেত্রে প্রতারণা ঠেকানো এবং নাগরিকত্ব অর্জনের বাণিজ্যিক অপব্যবহার বন্ধ করা প্রয়োজন। ট্রাম্প প্রশাসন তথাকথিত জন্ম-পর্যটনকে দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসন নীতির একটি সমস্যা হিসেবে তুলে ধরছে।
এখানে আইনি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। আদালত যদি মনে করে নির্বাহী আদেশ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তাহলে প্রশাসনের পাসপোর্ট-সংক্রান্ত বাস্তবায়নও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আবার আদালত যদি কোনো অংশ অনুমোদন করে, তাহলে পররাষ্ট্র দপ্তরকে নতুন প্রশাসনিক নির্দেশনা তৈরি করতে হতে পারে।
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের পরিবার যারা যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর সন্তানের পাসপোর্ট বা নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নথি নিয়ে কাজ করছেন, তাদের জন্য এই বিষয়টি বিশেষ নজর রাখার মতো। তবে এখনই পুরোনো পাসপোর্ট নিয়ম বাতিল হয়েছে বা প্রত্যেক শিশুর পাসপোর্টে নতুন বাধ্যতামূলক শর্ত কার্যকর হয়েছে—এমন দাবি করা ঠিক হবে না।