২ লাখ কর্মীর ঘোষণা, ৪৮ ঘণ্টায় মালয়েশিয়ার অস্বীকৃতি—নেপথ্যে কি ২০২৪-এর সিন্ডিকেট?

বাংলাদেশ থেকে ছয় মাসে দুই লাখ কর্মী নেওয়ার খবর প্রকাশের মাত্র দুই দিনের মধ্যে সেই দাবির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছে মালয়েশিয়া। ৩১ আগস্ট বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, মালয়েশিয়া আগামী ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে প্রায় দুই লাখ কর্মী নেবে। কিন্তু ২ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার যোগাযোগমন্ত্রী ও সরকারের মুখপাত্র ফাহমি ফাজিল বলেন, এই ঘোষণা মালয়েশিয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মানবসম্পদমন্ত্রী রামানান রামাকৃষ্ণান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন

২ লাখ কর্মীর ঘোষণা, ৪৮ ঘণ্টায় মালয়েশিয়ার অস্বীকৃতি—নেপথ্যে কি ২০২৪-এর সিন্ডিকেট?

২ লাখ কর্মীর ঘোষণা, ৪৮ ঘণ্টায় মালয়েশিয়ার অস্বীকৃতি—নেপথ্যে কি ২০২৪-এর সিন্ডিকেট?


বাংলাদেশ থেকে ছয় মাসে দুই লাখ কর্মী নেওয়ার খবর প্রকাশের মাত্র দুই দিনের মধ্যে সেই দাবির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছে মালয়েশিয়া। ৩১ আগস্ট বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, মালয়েশিয়া আগামী ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে প্রায় দুই লাখ কর্মী নেবে। কিন্তু ২ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার যোগাযোগমন্ত্রী ও সরকারের মুখপাত্র ফাহমি ফাজিল বলেন, এই ঘোষণা মালয়েশিয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মানবসম্পদমন্ত্রী রামানান রামাকৃষ্ণান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। এর পেছনে রয়েছে ২০২২-২৪ সালের বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি—সীমিতসংখ্যক নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক কর্মী পাঠানো, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, চাকরির নিশ্চয়তা না থাকা, হাজার হাজার কর্মীর শেষ মুহূর্তে আটকে পড়া এবং নিয়োগ ব্যবস্থায় দুর্নীতি ও মানবপাচারের অভিযোগ।

২০২৪: যে সংকটে মালয়েশিয়া শ্রমবাজার বন্ধ করে

২০২২ সালে প্রায় চার বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খুললে দেশটির কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগে মাত্র ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে অনুমোদন দেয়। অথচ বাংলাদেশে লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ছিল প্রায় ১,৫০০-এর বেশি। ফলে একটি সীমিত গোষ্ঠীর হাতে বিপুল শ্রমবাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে যায়।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার ২০২১ সালের সমঝোতা অনুযায়ী কর্মী নিয়োগের ব্যয় নির্ধারণের কাঠামো ছিল। বাংলাদেশে একজন কর্মীর নির্ধারিত ব্যয় প্রায় ৭৮,৯৯০ টাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন তদন্ত ও গবেষণায় দেখা যায়, মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য বহু বাংলাদেশি কর্মী ৪.৫ থেকে ৬ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত পরিশোধ করেছেন।

অর্থাৎ নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় বাস্তব অভিবাসন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এর ফলে বিদেশে যাওয়ার আগেই কর্মীরা ঋণের বোঝায় পড়েন। ILO-ও বলেছে, ২০২৩ সাল থেকে এমন ঘটনা সামনে আসে যেখানে বৈধ ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে মালয়েশিয়ায় পৌঁছেও কর্মীরা প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি।

৩১ হাজারের সংকট—তবে সংখ্যাটির ব্যাখ্যা জরুরি

২০২৪ সালের ৩১ মে মালয়েশিয়ার নির্ধারিত প্রবেশসীমা শেষ হওয়ার আগে ঢাকার বিমানবন্দরে হাজার হাজার কর্মী জড়ো হন। তখন BMET-এর হিসাবে প্রায় ৩১ হাজার সম্ভাব্য কর্মী প্রয়োজনীয় ক্লিয়ারেন্স পাননি, কারণ টিকিট সংকট এবং শেষ মুহূর্তের চাপের কারণে ক্লিয়ারেন্স দেওয়া বন্ধ করা হয়েছিল।

তবে পরবর্তী সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১৬,৯৭০ কর্মী BMET ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পরও ৩১ মে’র মধ্যে মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি। তাঁদের কেউ টিকিট পাননি, আবার কারও ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ায় নিয়োগকর্তার গ্রহণের নিশ্চয়তা ছিল না।

এ কারণে সংবাদে “৩১ হাজার কর্মী আটকে পড়েছিলেন” বলার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। ৩১ হাজার ছিল একটি বৃহত্তর পর্যায়ের আবেদন/ক্লিয়ারেন্স-সংক্রান্ত সংখ্যা; আর ১৬,৯৭০ ছিল ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পরও সময়সীমার মধ্যে যেতে না-পারা কর্মীদের সরকারি হিসাব।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ২০২৪ সালের সংকটের প্রকৃত মাত্রা বুঝতে হলে একই সঙ্গে দুই ধরনের সংখ্যা আলাদা করে দেখতে হয়।

বিমান টিকিটও হয়ে ওঠে সংকটের অংশ

শেষ মুহূর্তে বিপুলসংখ্যক কর্মী পাঠানোর চাপে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া রুটে বিমান টিকিটের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। তৎকালীন প্রতিবেদনে স্বাভাবিক মাসিক ১৬-১৮ হাজার টিকিটের চাহিদার বিপরীতে প্রায় ৬০ হাজার পর্যন্ত চাহিদার কথা উঠে আসে এবং ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়।

ফলে যে শ্রমিকরা কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করে ভিসা ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছিলেন, তাঁদের একটি অংশ শেষ মুহূর্তে টিকিট না পেয়ে ঢাকায় আটকে যান। অন্যদিকে কিছু কর্মী মালয়েশিয়ায় পৌঁছেও বিমানবন্দরে নিয়োগকর্তার প্রতিনিধি না পাওয়ার অভিযোগ করেন।

এ সংকটকে শুধু “টিকিট সংকট” হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। কারণ টিকিটের সমস্যা তৈরি হয়েছিল এমন একটি নিয়োগপ্রক্রিয়ার শেষে, যেখানে বিপুল সংখ্যক কর্মীকে অল্প সময়ের মধ্যে পাঠানোর চাপ তৈরি হয়েছিল।

সিন্ডিকেটের অভিযোগ কোথায়?

২০২২-২৪ সালের ব্যবস্থার সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ ছিল ১০১ এজেন্সির সীমিত নিয়োগ কাঠামো।

বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সংগঠন BAIRA দাবি করেছিল, মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকেই এজেন্সি নির্বাচনের কাঠামো তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে বিভিন্ন অনুসন্ধানে অভিযোগ ওঠে, নির্বাচিত এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে ব্যবসা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় “সিন্ডিকেট” গড়ে ওঠে।

The Daily Star-এর অনুসন্ধানে বলা হয়, ১০১ এজেন্সির মাধ্যমে প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় যান এবং অনেক কর্মীর কাছ থেকে নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় বহুগুণ অর্থ নেওয়া হয়।

২০২৪ সালের সংকটের পর জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। OHCHR-এর নথিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় সক্রিয় কথিত অপরাধী নেটওয়ার্ক, ভুয়া নিয়োগকর্তা, অতিরিক্ত নিয়োগ ফি, ঋণনির্ভরতা এবং চাকরি না পাওয়ার অভিযোগ নথিভুক্ত হয়। নথিতে প্রায় ১ লাখ সম্ভাব্য ভুক্তভোগীর অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

এখানে অবশ্য একটি সতর্কতা জরুরি: জাতিসংঘের নথিতে এগুলো অভিযোগ/তথ্য হিসেবে উপস্থাপিত, আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে নয়।

বাংলাদেশের ভেতরেও তদন্ত ও মামলা

২০২৪ সালের সংকটের পর বাংলাদেশে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন ১০১ এজেন্সির কয়েকটির বিরুদ্ধে মামলা করে। The Daily Star-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ACC ৬৭,৩৮০ ব্যক্তির কাছ থেকে নির্ধারিত হারের প্রায় পাঁচ গুণ অর্থ নেওয়ার অভিযোগে ১২টি এজেন্সির মালিকসহ ৩৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে; অভিযোগে প্রায় ১,১২৮ কোটি টাকা আত্মসাত ও পাচারের কথা বলা হয়।

২০২৬ সালেও বিষয়টি পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলের খবর প্রকাশিত হয়েছে; এর মধ্যে ২০২২-২৪ সালের মালয়েশিয়া-সংশ্লিষ্ট আলোচিত এজেন্সিও ছিল।

অর্থাৎ নতুন করে শ্রমবাজার খোলার আলোচনা এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন আগের ব্যবস্থার কিছু অংশ নিয়ে আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এখনো চলমান।

BOESL: বিকল্প মডেলের সম্ভাবনা

এই জায়গায় Bangladesh Overseas Employment and Services Ltd—BOESL গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সরকারি BOESL-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, মালয়েশিয়ার সঙ্গে “Special One-Off Recruitment Project”-এর মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। এ ব্যবস্থায় মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তারা কর্মী নির্বাচন করতেন এবং BOESL-এর মাধ্যমে কর্মী পাঠানো হতো। সরকারি প্রতিবেদনে ওই প্রকল্পের অধীনে ৬টি কোম্পানিতে ১৫,০২৬ কর্মী পাঠানোর কথা বলা হয়েছে এবং তুলনামূলকভাবে কম অভিবাসন ব্যয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ মডেলের মূল পার্থক্য ছিল—মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমানো এবং নিয়োগকর্তা ও কর্মীর মধ্যে তুলনামূলক সরাসরি সংযোগ তৈরি করা।

২০২৬ সালের এপ্রিলেও মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ পুনরায় শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে আলোচনা করে। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী রামানান তখন স্পষ্টভাবে বলেন, পুনরায় নিয়োগ মালয়েশিয়ার sectoral needs বা খাতভিত্তিক প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করবে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমানো, খরচ কমানো ও অনুমোদিত এজেন্সি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। মালয়েশিয়া প্রযুক্তি ও AI-ভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থার কথাও বলেছে।

এটি ২০২৪ সালের মডেলের তুলনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

২০২৬: কেন আবার ২ লাখের প্রশ্ন?

জুন ২০২৬-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খোলার অনুরোধ করেন। দুই দেশের নেতারা স্বচ্ছতা, ন্যায্য নিয়োগ এবং কর্মীদের সুরক্ষার বিষয়ে একমত হন। আনোয়ার ইব্রাহিমও বলেন, বিদেশি কর্মী মালয়েশিয়ার অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও শ্রমিক শোষণ ও দুর্ব্যবহার গ্রহণযোগ্য নয়।

অর্থাৎ জুনে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনার মূল শব্দ ছিল “reopen”, “transparency”, “fair recruitment”—কিন্তু নির্দিষ্টভাবে ছয় মাসে দুই লাখ কর্মীর ঘোষণা নয়।

এরপর ৩১ আগস্ট বাংলাদেশের একজন প্রতিমন্ত্রী দুই লাখ কর্মীর সম্ভাব্য নিয়োগের কথা প্রকাশ্যে আনেন। কিন্তু ২ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়া জানিয়ে দেয়, এটি তাদের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়।

মালয়েশিয়া কেন আপত্তি করল?

মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী রামানানের নীতিগত বক্তব্যগুলো এই প্রশ্নের উত্তর দেয়। জুলাই ২০২৬-এ তিনি বলেন, স্থানীয় মালয়েশিয়ানদের চাকরিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং বিদেশি কর্মী কেবল প্রয়োজন হলে নিয়োগ করা হবে।

এপ্রিলের বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া আলোচনাতেও মালয়েশিয়া বলেছিল, বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ হবে sectoral needs অনুযায়ী।

আর ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ মালয়েশিয়ার শ্রম কর্তৃপক্ষ foreign worker quota freeze extended ঘোষণা করে।

তাই একই সময়ে একদিকে ২ লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার খবর এবং অন্যদিকে মালয়েশিয়ার বিদেশি কর্মী কোটা নিয়ন্ত্রণের নীতি—দুটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এখানে সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা হলো, বাংলাদেশে যে দুই লাখের সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছে, সেটি কোনো চূড়ান্ত Malaysian Cabinet-approved quota নয়; বরং শ্রমবাজার পুনরায় খোলার আলোচনা বা সম্ভাব্য চাহিদাকে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যায় উপস্থাপন করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক স্বার্থ: দুই দেশের লাভ কোথায়?

বাংলাদেশের স্বার্থ

বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের গুরুত্ব তিনটি জায়গায়।

প্রথমত, বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি সেখানে কর্মরত।

দ্বিতীয়ত, বিদেশে কর্মসংস্থান বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস।

তৃতীয়ত, মালয়েশিয়ার বাজার খুললে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শ্রমবাজার দ্রুত সক্রিয় হয়।

ফলে দুই লাখ নতুন কর্মীর সুযোগ সৃষ্টি হলে এর সঙ্গে শুধু কর্মসংস্থান নয়, রেমিট্যান্স প্রবাহও যুক্ত হবে।

মালয়েশিয়ার স্বার্থ

মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতেও বাংলাদেশি কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি এবং বিভিন্ন শ্রমঘন খাতে বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজন রয়েছে।

কিন্তু মালয়েশিয়া একই সঙ্গে বিদেশি শ্রমিক ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চাইছে। তাই তাদের কাছে প্রশ্নটি শুধু “কতজন কর্মী প্রয়োজন” নয়; বরং কোন খাতে, কোন নিয়োগকর্তার জন্য, কোন পদ্ধতিতে এবং কত খরচে কর্মী আসবে—এগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক অর্থনীতি: সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানে

২০২৪ সালের অভিজ্ঞতার পর শ্রমবাজার পুনরায় খোলা বাংলাদেশের জন্য যেমন অর্থনৈতিক সুযোগ, তেমনি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়।

কারণ একটি বড় শ্রমবাজার মানে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য অভিবাসন-ব্যবসা। কর্মীপ্রতি অতিরিক্ত কয়েক লাখ টাকা নিলে কয়েক লাখ কর্মীর ক্ষেত্রে মোট অর্থের পরিমাণ দ্রুত হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে যায়।

এই কারণেই ২০২৪ সালের সংকটে “সিন্ডিকেট” শব্দটি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তবে এটিও বলা জরুরি—নতুন ২ লাখ কর্মী পাঠানোর পেছনে কোনো নতুন সিন্ডিকেট বা রাজনৈতিক অর্থনৈতিক চুক্তি হয়েছে—এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। এটি তদন্তযোগ্য প্রশ্ন, প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়।

তাহলে BOESL কি সমাধান হতে পারে?

উপলব্ধ তথ্য বলছে, BOESL-ভিত্তিক মডেল একটি সম্ভাব্য বিকল্প।

এর কারণ:

নিয়োগ প্রক্রিয়া রাষ্ট্রীয় পর্যবেক্ষণে রাখা যায়;

কর্মী নির্বাচনে স্বচ্ছতা বাড়ানো সম্ভব;

মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমানো যায়;

নিয়োগ ব্যয় কমানো সম্ভব;

প্রকৃত নিয়োগকর্তার চাহিদা যাচাই করা যায়;

কর্মী মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর আগে চাকরির অস্তিত্ব যাচাই করা যায়।

২০২৬ সালের এপ্রিলের মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ আলোচনায়ও মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিয়োগ ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

তবে BOESL একাই ২ লাখ কর্মীর পুরো চাহিদা পূরণ করতে পারবে কি না, সেটি আলাদা প্রশাসনিক ও সক্ষমতার প্রশ্ন। তাই রাষ্ট্রীয় সংস্থা + কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত বেসরকারি এজেন্সি—এমন একটি যৌথ কিন্তু স্বচ্ছ মডেল প্রয়োজন হতে পারে।

২০২৬ সালের দুই লাখ কর্মী নেওয়ার ঘোষণা আসলে ২০২৪ সালের অসমাপ্ত শ্রমবাজার সংকটের ওপর নতুন একটি পরীক্ষা।

২০২৪ সালে প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পরও নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। ১০১টি এজেন্সির সীমিত কাঠামো, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, চাকরি না পাওয়ার অভিযোগ, বিমানবন্দরে আটকে পড়া কর্মী এবং ১৬,৯৭০ কর্মীর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেতে না পারা—সব মিলিয়ে মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ শ্রম করিডর বড় ধরনের আস্থার সংকটে পড়ে। ILO ও জাতিসংঘের নথিতেও শোষণ, ঋণনির্ভরতা ও মানবপাচারের ঝুঁকি উঠে আসে।

২০২৬ সালে দুই দেশের সরকার সেই পুরনো ব্যবস্থার পরিবর্তে স্বচ্ছ, নৈতিক, কম খরচের এবং খাতভিত্তিক নিয়োগের কথা বলছে। কিন্তু বাংলাদেশে দুই লাখ কর্মীর ঘোষণা এবং মালয়েশিয়ার সরকারি অস্বীকৃতি দেখিয়ে দিয়েছে—আলোচনা ও চূড়ান্ত সরকারি কোটা এখনো এক বিষয় নয়।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল “২ লাখ কর্মী যাবে কি না” তা নয় বরং   “কোন পদ্ধতিতে যাবে?” সেটা।

যদি পুরনো মধ্যস্বত্বভোগী-নির্ভর মডেল ফিরে আসে, তাহলে ২০২৪-এর সংকট পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থাকবে। আর যদি BOESL, ডিজিটাল যাচাই, নিয়োগকর্তা-নির্ভর চাহিদা যাচাই, Employer Pays নীতি এবং কঠোর এজেন্সি নজরদারি কার্যকর করা যায়, তাহলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য আবারও বড় ও টেকসই বৈদেশিক কর্মসংস্থানের উৎস হতে পারে।

বিশ্লেষণ : এস গোস্বামী, সিএসবি ইউএসএ

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর