অসুস্থ বাংলাদেশের বিদ্যুৎমন্ত্রী, খোঁজ নিতে গেলেন রাষ্ট্রপতি
একদিকে হাসপাতালের CCU-তে জীবনযুদ্ধ, অন্যদিকে তাঁরই মন্ত্রণালয় ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র প্রশ্ন। অসুস্থ হয়ে রাজধানীর ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে ভর্তি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে দেখতে বুধবার সকালে হাসপাতালে গেলেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। চিকিৎসকদের কাছ থেকে জানলেন মন্ত্রীর শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ তথ্য। আর ঠিক এমন এক সময়েই টুকুর অসুস্থতার খবর এলো, যখন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট নিয়ে জনদুর্ভোগ চরমে। ফলে হাসপাতালে অসুস্থ মন্ত্রীকে ঘিরে সহানুভূতির পাশাপাশি তাঁর দায়িত্ব, বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকট এবং অতীতের ‘খাম্বা’ বিতর্কও আবার সামনে এসেছে।
ঢাকা, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬: রাজধানীর ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে দেখতে হাসপাতালে গেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে যান রাষ্ট্রপতি। সেখানে তিনি টুকুর শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে তাঁর চিকিৎসা ও সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হন। রাষ্ট্রপতি মন্ত্রীর ছেলে আবেদ হাসান মাহমুদের সঙ্গেও কথা বলেন বলে রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব মোহাম্মদ ইউনুস আলী জানিয়েছেন।
এর আগে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে অসুস্থ অবস্থায় টুকুকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে (CCU) ভর্তি করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কয়েক দিন ধরে তিনি জ্বর, সর্দি ও কাশিতে ভুগছিলেন। চিকিৎসকদের পরামর্শে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।
অসুস্থ মন্ত্রীকে ঘিরে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ আরেক বাস্তবতা
টুকুর অসুস্থতার খবর এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত আবারও বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিং বেড়েছে। গ্যাস, এলএনজি, কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহে ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (PGCB) তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে The Daily Star জানিয়েছে, আগস্টের শুরুতে জাতীয় বিদ্যুৎ ঘাটতি দ্রুত বেড়ে যায়। ৬ আগস্ট ঘাটতি ছিল ৩৩৫ মেগাওয়াট, ৮ আগস্ট তা বেড়ে দাঁড়ায় ২,১৬৭ মেগাওয়াটে এবং পরদিন গড় ঘণ্টাভিত্তিক লোডশেডিং প্রায় ৩,০০০ মেগাওয়াটে পৌঁছে।
আরও উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যায় আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে। Dhaka Tribune-এর তথ্য অনুযায়ী, ৯ আগস্ট এক পর্যায়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩,৬৭১ মেগাওয়াটে এবং লোডশেডিং সর্বোচ্চ ৩,৭৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল। ওই সময় ঢাকাতেও একাধিক এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার ঘটনা ঘটতে থাকে।
সংকটের কেন্দ্রে গ্যাস ও জ্বালানি
চলমান বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে গ্যাসের ঘাটতি। জুলাইয়ের শেষ দিকে একটি এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যার পর জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। The Daily Star জানিয়েছে, ৩ আগস্ট পর্যন্ত ১৪৩টি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটের মধ্যে অন্তত ৬২টি জ্বালানি সংকটে ছিল; এর মধ্যে ২৬টি গ্যাসচালিত, ৩৩টি তরল জ্বালানিভিত্তিক এবং দুটি কয়লাভিত্তিক ইউনিট।
পরিস্থিতির প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। আগস্টের শুরুতে কয়েকটি বড় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায় এবং আরও কিছু কেন্দ্র উৎপাদন কমিয়ে দেয়। বিভিন্ন সময়ে জাতীয় চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ২,০০০ থেকে ৩,০০০ মেগাওয়াটের বেশি ব্যবধান তৈরি হয়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় অবশ্য সংকট মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। গত ৬ আগস্ট মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছিলেন, এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি মেরামতের পর দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছিলেন, গ্যাস সংকটের কারণে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং হয়েছে।
পুরোনো বিদ্যুৎ সংকটের স্মৃতিও ফিরছে আলোচনায়
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বর্তমান দায়িত্বের সঙ্গে তাঁর পুরোনো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিনি এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি আবারও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।
২০০১-২০০৬ সময়কালেও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত তীব্র সংকটের মুখে ছিল। সরকারের General Economics Division (GED)-এর একটি সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, ২০০১ থেকে ২০০৮ সালের দীর্ঘ সময়ে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল এবং পুরোনো গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও গ্যাস সরবরাহের সংকট ও যান্ত্রিক সমস্যায় ভুগছিল। এর ফলে বিপুল স্থাপিত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছিল না এবং ব্যাপক লোডশেডিং দেখা দেয়।
২০০৬ সালে সংকট এতটাই তীব্র হয়েছিল যে The Daily Star সে সময় জানায়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। একই বছর আরেক প্রতিবেদনে প্রায় ২,০০০ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের কথা উল্লেখ করা হয় এবং বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে ব্যাপক জনঅসন্তোষের কথাও উঠে আসে।
সেই সময়ের বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ইস্যু ছিল ‘খাম্বা’ বিতর্ক। বিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়িয়ে বিদ্যুৎ সংযোগের খুঁটি স্থাপন ও ক্রয়কে ব্যাপকভাবে সমালোচনা করা হয়েছিল। টুকু যেহেতু ওই সময় বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, পরবর্তী বছরগুলোতে তাঁর রাজনৈতিক সমালোচনায় বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। তবে এ বিষয়ে রাজনৈতিক অভিযোগ ও বাস্তব প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে আলাদা করে দেখা জরুরি; ‘খাম্বা’ বিতর্কের সঙ্গে দুর্নীতির যেসব অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে প্রচারিত হয়েছে, সেগুলোকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন না করাই সাংবাদিকতার দিক থেকে নিরাপদ।
এবারও বিদ্যুৎ সংকটের মুখে একই মন্ত্রী
দুই দশকেরও বেশি সময়ের ব্যবধানের পর ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আবার যখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে, তখন দেশ নতুন করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে পড়েছে। ফলে তাঁর অসুস্থতার খবরের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা, গ্যাস সরবরাহ এবং লোডশেডিং নিয়েও রাজনৈতিক আলোচনা তীব্র হয়েছে।
বিশেষ করে এমন সময়ে এই সংকট দেখা দিয়েছে, যখন দেশের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমান চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। কিন্তু পর্যাপ্ত গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানি না থাকায় সেই সক্ষমতার বড় অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অর্থাৎ বর্তমান সংকটকে শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বা স্থাপিত সক্ষমতার সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না; জ্বালানি সরবরাহ, আমদানি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ব্যবহার এবং গ্রিড ব্যবস্থাপনাও এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
রাজনৈতিক চাপের মধ্যেই হাসপাতালে মন্ত্রী
ফলে একদিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর দ্রুত সুস্থতা কামনা করছেন তাঁর দল ও পরিবারের সদস্যরা, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকারের ওপর বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ।
টুকুর দায়িত্বে থাকা মন্ত্রণালয়ের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহ স্থিতিশীল করা, বন্ধ থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে উৎপাদনে ফেরানো, কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং রাজধানীসহ সারা দেশে লোডশেডিং কমিয়ে আনা।
তবে মন্ত্রীর অসুস্থতার সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকটের দায়কে সরাসরি এক করে দেখা ঠিক হবে না। বর্তমান সংকটের পেছনে তাৎক্ষণিক জ্বালানি সরবরাহ সমস্যা যেমন রয়েছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আমদানি নির্ভরতা, গ্যাস উৎপাদন ও অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও রয়েছে।
এখন রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এই সংকট কত দ্রুত কাটবে এবং মন্ত্রী সুস্থ হয়ে দায়িত্বে ফিরলে সরকার কীভাবে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান দিতে পারে।




